
ছবি- সংগৃহীত
ডেইলি স্টারে প্রকাশিত ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য অনুসারে, ২০১৯ সাল থেকে ৬৯,০০০-এরও বেশি বাংলাদেশী নারী প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। তাঁদের অনেকের অভিযোগ, বিদেশে তাঁরা নির্যাতন, শোষণ ও নানা ধরনের অপব্যবহারের শিকার হয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশী নারীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে যে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে, তা-ই এসব তথ্যে ফুটে উঠেছে। একই সঙ্গে নির্যাতনের শিকার নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়া, ক্ষতিপূরণ লাভ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার সুযোগ নিয়ে এখনও রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের বরাত দিয়ে গত ২৯ এপ্রিল ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে জানানো হয়, গত আট বছরে অন্তত ৭৯৯ জন নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) রেকর্ডের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানায়, ২০০৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১.২৫ মিলিয়নের (১২ লাখ ৫০ হাজার) বেশি বাংলাদেশী নারী কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ পাড়ি জমিয়েছেন—যাঁদের বেশিরভাগই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে।
সম্পাদকীয়তে এমন কিছু ঘটনার কথা তুলে ধরা হয় যেখানে নারীরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, খাদ্যাভাব, বকেয়া বেতন এবং অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার মুখোমুখি হয়েছেন। দেশে ফিরে আসা বেশ কয়েকজন নারী জানান, তাঁদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, যার ফলে তাঁরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা বা সাহায্য চাওয়ার সুযোগ পাননি।
রহিমা (ছদ্মনাম) নামের এক নারী জানান, সৌদি আরবে তাঁকে একটি অফিস জব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাঁকে নির্যাতনমূলক পরিবেশে বাসাবাড়ির কাজ করতে বাধ্য করা হয়। মিথ্যা চাকরির প্রলোভনে বিদেশে গিয়ে প্রতারিত হওয়া আরেক নারী জানান, তাঁকে আটকে রেখে বারবার ধর্ষণ করা হয়েছে।
আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ না থাকা এখনও একটি বড় উদ্বেগ হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির একটি গবেষণার বরাত দিয়ে সম্পাদকীয়টিতে বলা হয়, জরিপে অংশ নেওয়া ফেরত আসা নারীদের প্রায় অর্ধেকই কোন আইনি সহায়তা চাননি, কারণ তাঁরা সহায়তা পাওয়ার উপায় সম্পর্কে জানতেন না অথবা তাঁদের সেই সুযোগ ছিল না।
সম্পাদকীয়তে উল্লিখিত বিএমইটি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নারী অভিবাসী শ্রমিকরা ২,০৩৬টি অভিযোগ দায়ের করেছেন। এর মধ্যে ১,৯৬৯টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে রেকর্ডে উল্লেখ রয়েছে। তবে এই অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে প্রতারণায় অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকে প্রকৃতপক্ষে জবাবদিহিতার আওতায় আনা গেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সম্পাদকীয়টি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনিয়মে অভিযুক্ত ১১০টি এজেন্সির মধ্যে আগের বছর মাত্র ১৪টিকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে থাকা বাংলাদেশ মিশনগুলোর মাধ্যমে আইনি সহায়তা পাওয়া ৩৯৫ জন অভিবাসী শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ১১ জন ছিলেন নারী।
সম্পাদকীয়তে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর নজরদারি জোরদার করা, বাংলাদেশ ও গন্তব্য দেশগুলোতে আইনি সহায়তার সুযোগ বৃদ্ধি, বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে বিদেশ যাওয়ার আগেই সম্ভাব্য প্রবাসী শ্রমিকদের তাঁদের অধিকার ও অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, অভিবাসন প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নারী শ্রমিকদের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।