
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া ঋণের তুলনায় ৬ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করেছিল সরকার। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং সরকারি ব্যয়ের চাপের মধ্যে ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার নিট ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, গত অর্থবছরের একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক ৪ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ সময়ে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের তুলনায় বেশি পরিশোধ করেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষেত্রেও নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ঋণাত্মক ২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এ লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২১ দশমিক ৬৫ শতাংশ ঋণ নিয়েছে সরকার।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি থাকায় সরকারি ব্যয় নির্বাহে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। অন্যদিকে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটসহ বিভিন্ন কারণে বেসরকারি খাতের ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আদায়ও চাপে পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৪ হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। গত জুন শেষে এ পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৯১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতি বেড়েছে ২৩ হাজার ২২৮ কোটি টাকা।
একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের স্থিতিও বেড়েছে। গত জুন শেষে এ খাতে ঋণের স্থিতি ছিল ৯৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৬৯ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে সরকারের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৯ হাজার ৭২১ কোটি টাকা।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে আসায় আপাতত সরকারকে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোর বড় ধরনের সমস্যা হচ্ছে না। তবে সরকারি ঋণের সুদহার কমে যাওয়ায় ব্যাংকের আয় ও মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারকে ঋণ দিয়ে ব্যাংক যে সুদ পাচ্ছে, তা আমানতের বিপরীতে দেওয়া সুদের চেয়েও কম।
এদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়েও বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জুলাই ও আগস্টে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮১ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৫৫ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। ফলে এ দুই মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায়ের হার ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি, সরকারি ব্যয়ের চাপ এবং বেসরকারি খাতে ধীরগতির মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সরকারি ঋণের সুদহার ও ব্যাংকের মুনাফার সম্পর্কও ব্যাংক খাতের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে।