News update
  • কোনো ষড়যন্ত্র দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারবে না : প্রধানমন্ত্রী     |     
  • সৌদির সড়কে একসঙ্গে ঝরলো ৭ বাংলাদেশির প্রাণ     |     
  • হাম উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু     |     
  • নেতাকর্মীদের সঙ্গে পায়ে হেঁটে সার্বভৌমত্ব র‌্যালিতে প্রধানমন্ত্রী     |     
  • গ্রাম পুলিশের বেতন বাড়িয়েছে সরকার, আজ থেকেই কার্যকর     |     
সাহিত্য ও সাময়িকী বঙ্গলোক ডেস্ক প্রথম পাতা 2026-10-15, 7:03pm

বেগম রোকেয়া: নারী জাগরণের অগ্রদূত, যিনি বদলে দিতে চেয়েছিলেন সমাজ

begom-ro-2f833b0e8411ea98de9714c469bd621a1792069399.jpg


নারীশিক্ষা, নারীর অধিকার ও সমতার প্রশ্নে উপমহাদেশের ইতিহাসে যে কয়েকজন মনীষী চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তাদের অন্যতম। যে সময়ে নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ কিংবা নিজের মত প্রকাশ করাকে সমাজের বড় একটি অংশ ভালো চোখে দেখত না, সে সময়ে তিনি নারীশিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার সাহসী উদ্যোগ নেন। লেখনী, সমাজ সংস্কার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি নারীদের আত্মমর্যাদা, স্বাধীন চিন্তা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন। তার জীবন কেবল একজন সাহিত্যিকের জীবন নয়, বরং বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুক্তি, শিক্ষা ও মানবিকতার শক্তিতে লড়াই করার এক অনন্য ইতিহাস।

রক্ষণশীল সমাজে জন্ম ও বেড়ে ওঠা

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা জহীরউদ্দীন মুহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের ছিলেন জমিদার পরিবারের সদস্য। সে সময় মুসলিম সমাজের রক্ষণশীল পরিবেশে মেয়েদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। পরিবারের ছেলেদের পড়াশোনায় উৎসাহ দেওয়া হলেও মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে নানা বাধা ছিল।

এমন পরিবেশে বেড়ে উঠেও রোকেয়া জ্ঞান অর্জনের প্রতি গভীর আগ্রহী হয়ে ওঠেন। বড় ভাই ইব্রাহিম সাবের ও বোন করিমুন্নেসার সহযোগিতায় তিনি বাংলা ও ইংরেজি শেখার সুযোগ পান। পরিবারের এই সহযোগিতা তার চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে। পরবর্তী সময়ে নারীশিক্ষা নিয়ে তার যে সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার পেছনে এই প্রাথমিক শিক্ষালাভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রোকেয়া উপলব্ধি করেছিলেন, শিক্ষা থেকে নারীকে দূরে রাখলে তার ব্যক্তিগত বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয় এবং সমাজও অগ্রগতির পথ হারায়। এই উপলব্ধিই তাকে নারীশিক্ষার প্রসারে আজীবন কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে।

দাম্পত্য জীবন ও স্বামীর অনুপ্রেরণা

মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিহারের ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয়। তার স্বামী ছিলেন শিক্ষিত ও উদার মানসিকতার মানুষ। তিনি রোকেয়াকে বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শেখা এবং সাহিত্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। স্বামীর সহযোগিতা রোকেয়ার চিন্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯০৯ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর রোকেয়া বড় ধরনের আর্থিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি নিজের লক্ষ্য থেকে সরে যাননি। বরং নারীদের শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী করে তোলার কাজে নিজেকে আরও নিবেদিত করেন। স্বামীর রেখে যাওয়া অর্থ কাজে লাগিয়ে তিনি ভাগলপুরে মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে কলকাতায় গিয়ে সেই উদ্যোগকে নতুনভাবে এগিয়ে নেন।

নারীশিক্ষার আলো ছড়াতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা

বেগম রোকেয়ার জীবনের অন্যতম বড় অবদান সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা। ১৯০৯ সালে ভাগলপুরে বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়ে ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু করে।

শুরুতে ছাত্রীসংখ্যা ছিল খুবই কম। রক্ষণশীল সমাজের বিরোধিতা, অভিভাবকদের অনীহা এবং নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। মেয়েদের শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে অভিভাবকদের বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন, তাদের আশ্বস্ত করেছেন এবং কন্যাসন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে উৎসাহিত করেছেন।

তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, মেয়েদের বাস্তব জীবনে কাজে লাগে এমন বিভিন্ন বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হতো। বাংলা, ইংরেজি, গণিতের পাশাপাশি সেলাই, কারুশিল্প ও শারীরিক শিক্ষার মতো বিষয়ও গুরুত্ব পায়। রোকেয়া বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে এবং নিজেদের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াবে।

লেখনীতে সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

বেগম রোকেয়া শুধু শিক্ষাবিদ ছিলেন না, বাংলা সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক ও চিন্তাবিদও ছিলেন। তার সাহিত্যকর্মে নারী-পুরুষের বৈষম্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার এবং নারীর ওপর সামাজিক বিধিনিষেধের সমালোচনা উঠে এসেছে। যুক্তি, ব্যঙ্গ ও কল্পনার মাধ্যমে তিনি প্রচলিত সমাজব্যবস্থার অসংগতি তুলে ধরেছেন।

১৯০৫ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত Sultana's Dream তার অন্যতম বিখ্যাত রচনা। বাংলা ভাষায় এটি ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে পরিচিত। এ রচনায় তিনি ‘লেডিল্যান্ড’ নামে এক কাল্পনিক সমাজের ছবি এঁকেছেন, যেখানে নারীরা রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিজ্ঞানচর্চায় নেতৃত্ব দেয়, আর পুরুষেরা ঘরের ভেতরে অবস্থান করে। কল্পনার এই উল্টো চিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বৈষম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন।

তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ‘মতিচূর’, ‘পদ্মরাগ’ ও ‘অবরোধবাসিনী’। ‘পদ্মরাগ’ উপন্যাসে নারীর আত্মনির্ভরতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের চিত্র ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে ‘অবরোধবাসিনী’তে পর্দাপ্রথার নামে নারীদের বন্দিত্ব এবং এর ফলে সৃষ্ট নানা সামাজিক সমস্যার চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি।

রোকেয়ার লেখার মূল কথা ছিল, নারীর অগ্রগতির পথ বন্ধ করে রেখে কোনো সমাজ প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে পারে না। তার সাহিত্য আজও নারী অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।

নারী সংগঠন ও সামাজিক সংস্কারে ভূমিকা

নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বেগম রোকেয়া বুঝেছিলেন, শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না; নারীদের মধ্যে সচেতনতা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সংগঠিত হওয়ার মানসিকতাও তৈরি করতে হবে। এ লক্ষ্য নিয়ে ১৯১৬ সালে তিনি ‘আঞ্জুমানে খাওয়াতিনে ইসলাম’ প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটির মাধ্যমে নারীশিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা এবং নারীদের উন্নয়নে কাজ করা হয়।

নারীদের শিক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও আত্মনির্ভরশীলতার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন। তার চিন্তায় নারী কেবল পরিবারের দায়িত্ব পালনকারী নন, বরং সমাজের একজন পূর্ণাঙ্গ সদস্য। নিজের যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখার অধিকার নারীরও রয়েছে।

১৯২৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় নারীশিক্ষা সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার মধ্য দিয়ে নারীশিক্ষার আন্দোলনে তার নেতৃত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি ধর্মীয় পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের সীমার মধ্যে নারীকে আবদ্ধ না রেখে শিক্ষার মাধ্যমে বৃহত্তর সমাজের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পক্ষে কাজ করেছেন।

আজও প্রাসঙ্গিক রোকেয়ার আদর্শ

বেগম রোকেয়ার জীবন ছিল একদিকে সাহিত্যসাধনা, অন্যদিকে সামাজিক পরিবর্তনের নিরলস প্রচেষ্টা। তার সময়ে মেয়েদের শিক্ষার পথে যে বাধা ছিল, তার অনেক কিছু বদলেছে। বর্তমানে নারীরা শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশাসন, বিজ্ঞান, সাংবাদিকতা, ব্যবসা ও রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। তবে বাল্যবিয়ে, শিক্ষায় বৈষম্য, কর্মক্ষেত্রে অসম সুযোগ এবং নারীর প্রতি সহিংসতার মতো সমস্যা এখনো সমাজে বিদ্যমান।

এ বাস্তবতায় রোকেয়ার আদর্শ নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। নারীকে এগিয়ে নেওয়ার অর্থ পুরুষকে পিছিয়ে দেওয়া নয়; বরং নারী-পুরুষের সমান মর্যাদা, সুযোগ ও অধিকার নিশ্চিত করা। শিক্ষিত নারী পরিবারকে যেমন সমৃদ্ধ করেন, তেমনি দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামগ্রিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন।

১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় বেগম রোকেয়া মৃত্যুবরণ করেন। দিনটি তার জন্মদিনও। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস পালিত হয় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য নারীদের বেগম রোকেয়া পদক দেওয়া হয়।

বেগম রোকেয়া আজ আর কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ কোনো নাম নন। তিনি এমন এক চিন্তার প্রতীক, যেখানে শিক্ষা মানুষকে মুক্ত করে, যুক্তি কুসংস্কারকে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং আত্মমর্যাদা মানুষকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখায়। তার জীবন ও কর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমাজ বদলাতে সব সময় ক্ষমতা কিংবা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন সাহস, দূরদৃষ্টি এবং মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা। যে স্বপ্ন নিয়ে তিনি নারীশিক্ষার আন্দোলন শুরু করেছিলেন, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আজও সমাজের প্রতিটি মানুষের।