
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবট প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনার মধ্যেই ২০২৬ সালের মূলধনি ব্যয়ের পূর্বাভাস ২০ শতাংশ কমিয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা। একই সময়ে কোম্পানিটি তৃতীয় প্রান্তিকে প্রত্যাশার বিপরীতে ইতিবাচক মুক্ত নগদ প্রবাহ অর্জন করেছে। ইলন মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের সঙ্গে সম্ভাব্য একীভূতকরণ নিয়ে আলোচনার মধ্যে টেসলার এই আর্থিক অবস্থান নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে টেসলা জানায়, ২০২৬ সালে মূলধনি ব্যয় হতে পারে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস ছিল ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। তবে কোন খাতে ব্যয় কমানো হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি কোম্পানিটি।
৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া তৃতীয় প্রান্তিকে টেসলার মূলধনি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই ব্যয় দ্বিগুণ হলেও বিশ্লেষকদের গড় পূর্বাভাস ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে কম। এ সময়ে কোম্পানিটির মুক্ত নগদ প্রবাহ হয়েছে ১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। অথচ বিশ্লেষকেরা ৪ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারের নগদ ঘাটতির আশঙ্কা করেছিলেন।
টেসলা ও স্পেসএক্সকে একীভূত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। মঙ্গলবার মাস্ক বলেছেন, দুটি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করা ভালো ধারণা। এ বিষয়ে আলোচনা করতে উভয় কোম্পানিতে বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে বুধবার বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক ফোনালাপে এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য দেননি তিনি।
একীভূতকরণ সম্পন্ন হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি, রোবট, যোগাযোগব্যবস্থা ও পরিবহন খাতে মাস্কের বিভিন্ন উদ্যোগ একই প্রতিষ্ঠানের আওতায় আসতে পারে। তবে চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো ঘোষণা নেই।
টেসলার ব্যয় কমানো আর্থিক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। তবে এআই, চালকবিহীন ট্যাক্সি ও মানবসদৃশ রোবট তৈরির মতো খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে রোবট্যাক্সি সেবা চালুর অগ্রগতি মাস্কের আগের প্রতিশ্রুতির তুলনায় ধীর বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে স্পেসএক্সের এআই ও মহাকাশ অবকাঠামো সম্প্রসারণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে সম্ভাব্য একীভূতকরণের আর্থিক যৌক্তিকতা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
তৃতীয় প্রান্তিকে টেসলার আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও তা বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছাড়িয়েছে। তবে নিট মুনাফা কমেছে ৪৩ শতাংশ।
এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৫৩২টি গাড়ি সরবরাহ করেছে। টেসলার দাবি, গত চার বছরের মধ্যে তাদের যাত্রীবাহী গাড়ির অর্ডার জমার পরিমাণ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক বলেছেন, গাড়ির চাহিদা উৎপাদন সক্ষমতার চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
উত্তর আমেরিকায় নতুন গাড়ি সরবরাহের তিন-চতুর্থাংশের বেশি ক্ষেত্রে টেসলার তত্ত্বাবধানাধীন পূর্ণ স্বয়ংচালিত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। দ্বিতীয় প্রান্তিকের তুলনায় এ হার প্রায় ২০ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া ক্রেডিট বাদ দিয়ে তৃতীয় প্রান্তিকে টেসলার গাড়ি ব্যবসার মোট মুনাফার হার ছিল ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ছিল ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
টেসলার ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় এখন বৈদ্যুতিক গাড়ির পাশাপাশি এআই, স্বয়ংক্রিয় পরিবহনব্যবস্থা ও মানবসদৃশ রোবট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি কোম্পানিটির জ্বালানি সংরক্ষণ ব্যবসাও গাড়ি খাতের বাইরে আয়ের একটি সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে এসব প্রযুক্তিকে লাভজনক ব্যবসায় রূপ দেওয়ার সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে টেসলাকে। একদিকে বিনিয়োগকারীরা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও নগদ প্রবাহের উন্নতি দেখছেন, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে।
সম্ভাব্য স্পেসএক্স-টেসলা একীভূতকরণ শেষ পর্যন্ত কোন পর্যায়ে পৌঁছায়, তা নির্ভর করবে দুই প্রতিষ্ঠানের আলোচনা, আর্থিক শর্ত এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ওপর।