
ছবি: সংগৃহীত
সকাল হয়, ঘুম থেকে উঠি, সংসার সামলাই, কাজ করি, টাকা রোজগার করি, অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিই, রাত হলে ঘুমিয়ে পড়ি। আবার পরদিন সেই একই জীবন!
এই করতে করতেই একটা দিন বুড়ো হয়ে যাই, শরীর দুর্বল হয়ে আসে, প্রিয় মানুষগুলো একে একে দূরে চলে যায়। তারপর একদিন বুঝতে পারি, যেটাকে জীবন ভেবে এতদিন কাটিয়ে দিলাম, তার মধ্যে নিজের জন্যই সময় বের করতে পারলাম না!
সারাজীবন টাকা জমালাম, কিন্তু শান্তি জমাতে পারলাম না। বড় বাড়ি বানালাম, কিন্তু সেই বাড়িতে বসে মন খুলে হাসার সময় পেলাম না। মানুষের কাছে নিজের দাম বাড়াতে গিয়ে নিজের চোখেই নিজের মূল্য হারিয়ে ফেললাম।
অন্যের কাছে কী আছে, কে কোথায় ঘুরতে গেল, কে কত দামি পোশাক পরল, কার জীবন কত সুন্দর—এসব দেখতে দেখতে নিজের জীবনের আনন্দটাই অন্যের হাতে তুলে দিলাম।
একটা প্রশ্ন করি? আপনি কি নিজের জীবনটা বাঁচছেন, নাকি অন্যকে দেখানোর জন্য জীবন সাজাচ্ছেন?
যে টাকার জন্য আজ নিজের ঘুম নষ্ট করছেন, সেই টাকা কি একদিন আপনার হারিয়ে যাওয়া ঘুম ফিরিয়ে দিতে পারবে? যে সাফল্যের জন্য নিজের শরীরকে অবহেলা করছেন, সেই সাফল্য কি অসুস্থ শরীর নিয়ে উপভোগ করতে পারবেন? যে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য এত চেষ্টা করছেন, আপনার খারাপ সময়ে তাদের মধ্যে ক'জন পাশে থাকবে, তার কোনও নিশ্চয়তা আছে?
তাহলে এত অহংকার কিসের? এত দৌড় কিসের? এত হিংসে, এত প্রতিযোগিতা, এত অন্যকে ছোট করার চেষ্টা কিসের?
শেষ পর্যন্ত মৃত্যু কাউকে জিজ্ঞেস করবে না, আপনার ব্যাঙ্কে কত টাকা আছে, আপনার কত বড় পরিচয়, কিংবা সমাজে আপনার কতটা প্রতিপত্তি। মৃত্যু ধনী-গরিবের মধ্যে পার্থক্য করে না। অথচ আমরা সারাজীবন এমনভাবে বাঁচি, যেন পৃথিবীটা আমাদের চিরস্থায়ী ঠিকানা!
সবচেয়ে বড় বোকামি জানেন কী? সুখী হওয়ার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করা।
ভাবি, এই কাজটা শেষ হোক, তারপর একটু শান্তিতে থাকব। এই দায়িত্বটা মিটুক, তারপর নিজের জন্য বাঁচব। আর একটু টাকা হোক, তারপর জীবন উপভোগ করব।
কিন্তু দায়িত্ব শেষ হয় না, চাহিদা কমে না, টাকার হিসেব ফুরোয় না। শুধু আয়ুটা কমতে থাকে!
একদিন বুঝবেন, দামি রেস্তোরাঁয় খাওয়ার চেয়েও প্রিয় মানুষের সঙ্গে সাধারণ খাবার ভাগ করে নেওয়া বেশি আনন্দের ছিল। অনেক মানুষের প্রশংসা পাওয়ার চেয়েও একজন মানুষের নিঃস্বার্থ পাশে থাকা বেশি মূল্যবান ছিল। আর দামি উপহারের চেয়েও প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো কয়েকটা মুহূর্ত বেশি দামী ছিল।
কিন্তু তখন হয়তো সেই মানুষটা আর পাশে থাকবে না!
তাই অন্যের জীবন দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ ভাববেন না। সবাইকে হারিয়ে জেতার কোনও দরকার নেই। পৃথিবীর সব সম্পদ আপনার হবে না, সবাই আপনাকে ভালোবাসবে না, সব ইচ্ছাও পূরণ হবে না। তাতে কী এসে যায়?
আপনার নিজের একটা আকাশ থাকুক, নিজের মতো করে হাসার স্বাধীনতা থাকুক, মন খারাপ হলে কাঁদার অধিকার থাকুক, আর এমন দু-একজন মানুষ থাকুক, যাদের সামনে আপনাকে ভালো থাকার অভিনয় করতে হবে না।
কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয় গরিব হয়ে মারা যাওয়া নয়, জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয় হলো—বেঁচে থেকেও কোনও দিন মন খুলে বাঁচতে না পারা।
একদিন সব হিসেব থেমে যাবে। আপনার ঘর, আপনার সম্পদ, আপনার অহংকার, আপনার পরিচয়—সবকিছু পৃথিবীতেই পড়ে থাকবে। আপনি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারবেন না কিছুই।
তাই এখনও সময় আছে। একটু কম তুলনা করুন, একটু কম অভিযোগ করুন, একটু কম লোক দেখানো জীবন কাটান। আর একটু বেশি হাসুন, নিজের মানুষগুলোকে সময় দিন, নিজের পছন্দের কাজ করুন, ছোট ছোট আনন্দগুলোকে অবহেলা করবেন না।
কারণ মৃত্যু কবে আসবে, সেটা আপনার হাতে নেই। কিন্তু মৃত্যুর আগে বেঁচে থাকার যে সময়টুকু হাতে আছে, সেটাকে কীভাবে ব্যবহার করবেন, সেই সিদ্ধান্তটা অন্তত আপনার।
মনে রাখবেন, মৃত্যুর দিন আপনার জীবনের হিসেব শেষ হবে, কিন্তু তার আগেই যদি বাঁচার আনন্দ হারিয়ে ফেলেন, তাহলে নিঃশ্বাস চললেও জীবনটা অনেক আগেই থেমে গেছে।
শুধু বেঁচে থাকার জন্য বাঁচবেন না। এমনভাবে বাঁচুন, যেন একদিন পিছনে ফিরে তাকিয়ে বলতে পারেন—জীবনটা নিখুঁত ছিল না, কিন্তু আমি জীবনটাকে অবহেলা করিনি।