News update
  • কোনো ষড়যন্ত্র দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারবে না : প্রধানমন্ত্রী     |     
  • সৌদির সড়কে একসঙ্গে ঝরলো ৭ বাংলাদেশির প্রাণ     |     
  • হাম উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু     |     
  • নেতাকর্মীদের সঙ্গে পায়ে হেঁটে সার্বভৌমত্ব র‌্যালিতে প্রধানমন্ত্রী     |     
  • গ্রাম পুলিশের বেতন বাড়িয়েছে সরকার, আজ থেকেই কার্যকর     |     
স্নিগ্ধা রেজওয়ানা প্রথম পাতা 2026-10-31, 8:24pm

অন্তদর্শনের খসড়া ২৪

877167712_989219790312525_5394770898716122272_n-d79a45167ad1d0ba4c7244036650bc021793456657.jpg

ছবি: সংগৃহীত


হয়তো একদিন একটি আনন্দের কথা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। যাকে বলবেন ভেবেছিলেন, আজকাল তাকে কিছু বলার আগে ভাবতে হয়—বিরক্ত হবে না তো? ফোনটা রেখে দিলেন। ঘটনাটি বড় কিছু নয়। কিন্তু একসময় এই মানুষটিকেই তো সবচেয়ে ছোট কথাগুলো বলা যেত। সম্পর্কের দূরত্ব ঠিক কবে শুরু হয়েছিল, মনে নেই। শুধু জানেন, আগে কথা বলতে বলতে সময় ফুরোত; এখন সময় থাকলেও কথা জমে থাকে।

প্রথমে তার ব্যস্ততার কথা ভেবেছেন। তারপর অভিমান করেছেন। একসময় প্রশ্নটি নিজের দিকে ফিরেছে—আমার কথা কি আর ভালো লাগে না? আমাকে কি এতটাই চেনা হয়ে গেছে যে জানার মতো কিছু বাকি নেই? একজনের শোনার আগ্রহ কমেছে, অথচ সন্দেহ জন্মেছে নিজের কথাগুলো নিয়ে। সে আর আগের মতো জানতে চায় না; আমরা ভাবতে শুরু করি, আমাদের মধ্যেই হয়তো আর জানার মতো কিছু নেই।

এই ভুল এত সহজে ঘটে, কারণ প্রিয় মানুষের কাছে আমাদের একটি পরিচয় জমা থাকে। আমি সেই মানুষ, যার জন্য কেউ অপেক্ষা করে, যার অনুপস্থিতি টের পায়, যার এলোমেলো কথাও মন দিয়ে শোনে। এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজেকেও চিনতে শিখি। মানুষটি দূরে সরলে তাই শুধু তার সঙ্গের অভাব হয় না; তার কাছে নিজের যে রূপটি দেখেছিলাম, সেটিও ম্লান হয়ে আসে। তখন তাকে ফিরে পেতে চাওয়ার মধ্যে আরেকটি আকাঙ্ক্ষা মিশে থাকে—আমি আবার সেই মানুষটি হতে চাই, যাকে দেখে কারও চোখ উজ্জ্বল হতো।

এমন সময় অন্য কেউ আপনার একটি ছোট কথা মনে রাখল। কয়েক দিন পরে জানতে চাইল, যে বিষয়টি নিয়ে চিন্তায় ছিলেন, তার কী হলো। উত্তর দিতে গিয়ে একটু থামলেন। কত দিন পরে কেউ মনে রেখেছে! আরও কথা বলতে ইচ্ছা করল। মানুষটিকে ভালো লাগল। এই অনুভূতি সত্য। তবে তার মধ্যে নতুন কাউকে জানার আনন্দের সঙ্গে নিজের হারানো গুরুত্ব ফিরে পাওয়ার স্বস্তিও থাকতে পারে। কখনো সেই স্বস্তি এত গভীর হয় যে একটি মুহূর্তের ওপর গোটা ভবিষ্যৎ রেখে দিই। যে আজ শুনেছে, সে চিরকাল বুঝবে—মন এমন একটি প্রতিশ্রুতি শুনতে পায়, যা মানুষটি হয়তো দেয়ইনি।

জীবনের কোনো কোনো অধ্যায়ে এই আশার সঙ্গে তাড়াও জন্মায়। মনে হয়, অনেকটা পথ চলে এলাম। আবার কাউকে চেনা, নিজের কথা বোঝানো, বিশ্বাস করতে শেখা—আর কতবার? ফুরিয়ে যাওয়ার ভয় কেবল বয়সের নয়; আর কখনো কারও কাছে নতুন হয়ে উঠতে না-পারার আশঙ্কাও। তখন যত্ন পাওয়ার আনন্দের চেয়ে তা হারানোর ভয় বড় হয়ে ওঠে। যে কথায় কষ্ট পেয়েছি, তা বলতে সংকোচ হয়। মনে হয়, এতটুকু নিয়ে কথা বাড়িয়ে মানুষটিকেই যদি হারাই? আগে বলতে চাইতাম, আজ আমার কী হয়েছে, শোনো। এখন ভাবি, কী বললে সে শুনতে চাইবে?

এভাবেই সম্পর্কটি কখনো টিকে থাকে, অথচ তার মধ্যে নিজের মতো থাকার জায়গা কমে আসে। যে মানুষটির কাছে কথা বলতে পেরে স্বস্তি পেয়েছিলাম, তাকে ধরে রাখতেই কথা বাছতে শুরু করি। বাইরের কেউ হয়তো বলবে, দুজন তো ভালোই আছি। আমিও সহজে বোঝাতে পারব না কোথায় কষ্ট। মানুষটি পাশে আছে; শুধু তার পাশে বসে নিজের সব কথা বলা যায় না। তাকে হারাইনি বলে স্বস্তি পাই, কিন্তু নিজেকে কতখানি সরিয়ে রেখেছি, তার হিসাব নিই না।

আবার এই ভয় আমাদের অন্য মানুষটিকেও পুরো দেখতে দেয় না। তার নিজের ক্লান্তি আছে, আলাদা ইচ্ছা আছে, এমন দুঃখও আছে যার কেন্দ্র আমি নই। কখনো তাকে জানার চেয়ে তার কাছে নিজের গুরুত্বের নিশ্চয়তা পাওয়া জরুরি হয়ে ওঠে। মনে মনে বলি, আমাকে এমনভাবে চাও, যাতে নিজেকে নিয়ে আর সন্দেহ না হয়। তখন ভালোবাসার মানুষটিকে একটি অসম্ভব দায় দেওয়া হয়—সে আমার সঙ্গীও হবে, আমার না-ফুরোনোর প্রমাণও হবে। তার দিকে তাকিয়ে কি তাকে দেখছি, নাকি তার চোখে আমার ছবিটি আগের মতো আছে কি না, শুধু তা-ই দেখছি?

অথচ ভালোবাসায় দুজনের জীবন থাকে। সময়ের সঙ্গে তাদের চাওয়া বদলায়, যত্নের ভাষা বদলায়। কখনো পরিচয় গভীর হয়, কখনো দূরত্ব বাড়ে। আজকের মায়া ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। আবার ভবিষ্যতে তিক্ততা এসেছে বলেই অতীতের সমস্ত মায়া মিথ্যা হয়ে যায় না। এই দুই সত্য একসঙ্গে মানা কঠিন বলেই কখনো বলি, সবই ভুল ছিল; কখনো ভাবি, একদিন এত ভালো ছিল, তাই আজও থেকে যেতে হবে। কিন্তু একটি সম্পর্ক মূল্যবান ছিল—এ কথা স্বীকার করেও বোঝা যায়, সেখানে এখন আর ভালো থাকা সম্ভব হচ্ছে না।

তখন প্রশ্নটি শুধু তিক্ততা ছেড়ে মুগ্ধতা বেছে নেওয়ার থাকে না। প্রশ্ন হয়, আমি কোন ভয় নিয়ে কোথায় থাকছি, কোন আশা নিয়ে কার দিকে এগোচ্ছি। কাউকে প্রয়োজন হওয়া মানুষের ব্যর্থতা নয়। আমরা অন্যের যত্নে সাহস পাই, আনন্দ পাই, নিজের অচেনা দিক আবিষ্কার করি। কিন্তু একজনের জীবনে আমার জায়গা বদলেছে বলে নিজের বাকি জীবন সম্পর্কে কী করে নিশ্চিত হয়ে যাই? “সে আর আগের মতো আমাকে চায় না”—এর সঙ্গে কেন জুড়ে দিই, “আমাকে আর কেউ চাইবে না”? যে ভবিষ্যৎ এখনো আসেনি, তাকে অতীতের আঘাত দিয়ে চিনে ফেলি কীভাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর পেলেই কষ্ট সেরে যায় না। একদিন আবার সাধারণ কিছু ঘটবে। অভ্যাসবশত তাকেই বলতে ইচ্ছা করবে। ফোন হাতে নিয়ে থামবেন। অভাব থাকবে। তবু হয়তো সেদিন ঘটনাটির আনন্দ পুরোপুরি মুছে যাবে না। অন্য কাউকে বলবেন, লিখে রাখবেন, কিংবা নিজের মনেই আরেকবার হেসে উঠবেন। খুব সামান্য একটি মুহূর্ত। কোনো বড় ঘোষণা নেই। শুধু টের পাবেন, যে কথাটি সে শুনল না, সেটিও বলার মতো ছিল।

একজনের জীবনে নিজের জায়গা হারানোর শোক আছে। সেই শোক পালন করতে গিয়ে নিজের জীবন থেকেও সরে দাঁড়াতে হয় না।