
ইসলামের ইতিহাসে এমন ১০ জন সৌভাগ্যবান সাহাবি রয়েছেন, যারা মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর কাছ থেকে জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছিলেন। ইসলামের জন্য তাদের আত্মত্যাগ, ঈমানের দৃঢ়তা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, দানশীলতা ও অসামান্য অবদানের কারণে তারা মুসলিম উম্মাহর কাছে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। ইসলামের ইতিহাসে এই ১০ সাহাবি পরিচিত ‘আশারায়ে মুবাশশারা’ নামে। আরবি ‘আশারা’ অর্থ ১০ এবং ‘মুবাশশারা’ অর্থ সুসংবাদপ্রাপ্ত। অর্থাৎ আশারায়ে মুবাশশারা বলতে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবিকে বোঝায়।
এই সৌভাগ্যবান সাহাবিদের মধ্যে রয়েছেন ইসলামের প্রথম চার খলিফা আবু বকর (রা.), উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.), উসমান ইবনে আফফান (রা.) ও আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)। অন্য ছয়জন হলেন তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.), যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.), আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.), সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.), সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা.) এবং আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.)।
যে হাদিসে এসেছে ১০ সাহাবির নাম
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির নাম একসঙ্গে উল্লেখ করে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে বলেন, ‘আবু বকর জান্নাতি, উমর জান্নাতি, উসমান জান্নাতি, আলী জান্নাতি, তালহা জান্নাতি, যুবাইর জান্নাতি, আবদুর রহমান ইবনে আউফ জান্নাতি, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস জান্নাতি, সাঈদ জান্নাতি এবং আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ জান্নাতি।’
হাদিসটি সাহাবি আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) থেকে বর্ণিত। এটি জামে আত-তিরমিজির ৩৭৪৭ নম্বর হাদিসে সংকলিত হয়েছে।
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির পরিচয় ও অবদান
১. আবু বকর আস-সিদ্দিক (রা.)
আবু বকর (রা.) ছিলেন মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, ইসলামের প্রথম খলিফা এবং পুরুষদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। ইসলাম প্রচারের শুরুর দিকে তিনি নিজের সম্পদ ব্যয় করে নির্যাতিত মুসলমানদের মুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। হযরত বেলাল (রা.)-সহ বেশ কয়েকজন নির্যাতিত দাসকে তিনি মুক্ত করেছিলেন। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় মহানবী (সা.)-এর সফরসঙ্গী ছিলেন তিনি। সওর গুহায় অবস্থানকালে তার সাহচর্যের কথা পবিত্র কোরআনেও উল্লেখ রয়েছে। মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি মুসলিম উম্মাহর প্রথম খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২. উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)
উমর (রা.) ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা। ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি মুসলমানদের বিরোধিতা করলেও ইসলাম গ্রহণের পর হয়ে ওঠেন ইসলামের অন্যতম শক্তিশালী রক্ষক। তার ইসলাম গ্রহণ মুসলমানদের মনোবল বাড়িয়ে দেয়। ন্যায়বিচার, সাহসিকতা ও প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য তিনি ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত। তার শাসনামলে মুসলিম সাম্রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি জনকল্যাণ, জবাবদিহি ও সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ন্যায়বিচারের জন্য তিনি ‘আল-ফারুক’ উপাধিতে পরিচিত।
৩. উসমান ইবনে আফফান (রা.)
উসমান (রা.) ছিলেন ইসলামের তৃতীয় খলিফা। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, দানশীল ও লজ্জাশীল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। মহানবী (সা.)-এর দুই কন্যা রুকাইয়া (রা.) ও উম্মে কুলসুম (রা.)-এর সঙ্গে পর্যায়ক্রমে তার বিয়ে হওয়ায় তিনি ‘জুন-নুরাইন’ বা দুই জ্যোতির অধিকারী উপাধি লাভ করেন। মুসলমানদের পানির সংকট দূর করতে তিনি মদিনার রুমা কূপ কিনে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন। কোরআনের পাঠ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার শাসনামলে পবিত্র কোরআনের একটি মানসম্মত লিখিত সংকলনের অনুলিপি বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়।
৪. আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)
আলী (রা.) ছিলেন মহানবী (সা.)-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা। তিনি শৈশবেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই নবীজির পাশে ছিলেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ সাহসী, জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান। বদর, উহুদ, খন্দকসহ বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহানবী (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.)-এর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তিনি ইসলামের চতুর্থ খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জ্ঞান, বীরত্ব ও ন্যায়পরায়ণতার জন্য মুসলিম ইতিহাসে তার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
৫. তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)
তালহা (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের সাহাবিদের একজন। তিনি ইসলাম গ্রহণের পর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের বিশ্বাসে অটল ছিলেন। উহুদের যুদ্ধে মহানবী (সা.)-কে শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে তিনি অসাধারণ সাহসিকতা দেখান। নবীজিকে রক্ষা করতে গিয়ে তার হাত গুরুতরভাবে আহত হয়। এ কারণে তিনি মুসলিম ইতিহাসে আত্মত্যাগ ও ভালোবাসার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। তার সাহসিকতার জন্য মহানবী (সা.) তাকে বিশেষভাবে প্রশংসা করেছিলেন।
৬. যুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.)
যুবাইর (রা.) ছিলেন মহানবী (সা.)-এর ফুফাতো ভাই এবং ইসলামের প্রথম দিকের মুসলমানদের একজন। অল্প বয়সেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামের জন্য তার সাহসিকতা ও আত্মত্যাগ ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং মুসলিম বাহিনীর পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মহানবী (সা.) তাকে নিজের বিশেষ সহায়তাকারী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে তিনি একজন সাহসী যোদ্ধা ও বিশ্বস্ত সাহাবি হিসেবে স্মরণীয়।
৭. আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)
আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের অন্যতম দানশীল সাহাবি। মক্কায় ইসলাম গ্রহণের কারণে নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে তাকে। হিজরতের পর মদিনায় গিয়ে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় জীবন শুরু করেন। কিন্তু ব্যবসায়িক দক্ষতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি সফলতা অর্জন করেন। বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। নিজের সম্পদের বড় অংশ ইসলামের কল্যাণে এবং দরিদ্র মানুষের সহায়তায় ব্যয় করেছেন। তিনি ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির একজন এবং ইসলামের অন্যতম বিশিষ্ট পরামর্শদাতা।
৮. সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারী সাহাবিদের একজন। তিনি ছিলেন দক্ষ তিরন্দাজ ও সাহসী যোদ্ধা। ইসলামের পক্ষে তিনিই প্রথম তির নিক্ষেপ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। মহানবী (সা.)-এর বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে খলিফা উমর (রা.)-এর শাসনামলে মুসলিম বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি হিসেবে কাদিসিয়ার যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তার নেতৃত্বে পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মুসলমানরা গুরুত্বপূর্ণ বিজয় অর্জন করে।
৯. সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা.)
সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের একজন বিশিষ্ট সাহাবি। তার স্ত্রী ফাতিমা বিনতে খাত্তাব (রা.) ছিলেন উমর (রা.)-এর বোন। উমর (রা.) ইসলাম গ্রহণের আগেই সাঈদ (রা.) ও তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ইসলামের জন্য নানা প্রতিকূলতা ও নির্যাতন সহ্য করেও তারা নিজেদের বিশ্বাসে অবিচল ছিলেন। তিনি বদর যুদ্ধ ছাড়া মহানবী (সা.)-এর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। তার বর্ণনাতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ সাহাবির হাদিসের আরেকটি সূত্র পাওয়া যায়।
১০. আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ (রা.)
আবু উবাইদা (রা.) ছিলেন মহানবী (সা.)-এর অত্যন্ত বিশ্বস্ত সাহাবি। তার সততা, আমানতদারি ও নেতৃত্বের গুণাবলি ছিল অসাধারণ। মহানবী (সা.) তাকে এই উম্মতের আমানতদার হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। বদর, উহুদসহ বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। উহুদের যুদ্ধে মহানবী (সা.) আহত হলে তার মুখে বিদ্ধ হয়ে থাকা বর্মের অংশ দাঁত দিয়ে বের করতে গিয়ে নিজের দুটি দাঁত হারিয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে সিরিয়া অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ইসলামের ইতিহাসে আশারায়ে মুবাশশারার গুরুত্ব
জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত এই ১০ সাহাবির জীবন পর্যালোচনা করলে ইসলামের প্রাথমিক যুগের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে। তাদের কেউ ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক, কেউ সেনাপতি, কেউ ব্যবসায়ী, আবার কেউ ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানী ও পরামর্শদাতা। কিন্তু সবার মধ্যে একটি বিষয় ছিল অভিন্ন, তা হলো মহানবী (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা, ইসলামের প্রতি অবিচল বিশ্বাস এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আত্মত্যাগ।
তাদের জীবন থেকে মুসলমানরা ঈমানের দৃঢ়তা, সততা, ন্যায়বিচার, আমানতদারি, মানবসেবা ও দানশীলতার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। বিশেষ করে সম্পদ ও ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বিনয়ী থাকা যায়, মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখা যায় এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হওয়া যায়, তার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে তাদের জীবনে।
উল্লেখ্য, আশারায়ে মুবাশশারা বলতে একটি নির্দিষ্ট হাদিসে একসঙ্গে নাম উল্লেখ করে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত এই ১০ সাহাবিকে বোঝানো হয়। তবে তার অর্থ এই নয় যে, অন্য কোনো সাহাবি বা সাহাবিয়া জান্নাতের সুসংবাদ পাননি। হযরত খাদিজা (রা.), ফাতিমা (রা.) এবং আরও কয়েকজন সাহাবি পৃথক হাদিসে জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন।
সব মিলিয়ে আশারায়ে মুবাশশারার ১০ সাহাবির জীবন শুধু ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। তাদের ত্যাগ, নিষ্ঠা ও অবদান যুগের পর যুগ মুসলমানদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।