
মানুষের মতো হাঁটা, দৌড়ানো, নাচ কিংবা ডিগবাজি দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে চীনের তৈরি হিউম্যানয়েড রোবট। এবার এসব রোবটকে আরও বুদ্ধিমান ও কর্মদক্ষ করে তোলার প্রতিযোগিতায় নেমেছে দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। লক্ষ্য, শুধু নির্দেশ পালন নয়, বরং পরিবেশ বুঝে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নতুন কাজ শিখতে সক্ষম রোবট তৈরি করা।
এ লক্ষ্য পূরণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নতুন ক্ষেত্র ‘এমবডিড এআই’ নিয়ে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে রোবট চারপাশের পরিবেশ বুঝতে, অপরিচিত কাজ শিখতে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করতে পারবে।
রোববার (১ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনের এমবডিড এআই খাতে ৩২২টি বিনিয়োগ চুক্তির মাধ্যমে ৯ হাজার ৩৫০ কোটি ইউয়ান বা প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বিনিয়োগ পাঁচ গুণ।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এখন রোবটের বাহ্যিক কাঠামোর চেয়ে তার বুদ্ধিমত্তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ প্রতিযোগিতার কারণে রোবট তৈরির খরচ কমছে। ফলে শুধু হার্ডওয়্যার বিক্রি করে বড় মুনাফা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করছে, ভবিষ্যতে রোবটের প্রকৃত মূল্য তৈরি হবে তার এআই সক্ষমতায়।
চীনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও রোবটের বুদ্ধিমত্তা বাড়াতে কাজ করছে। উন্নত এআই গবেষণা ও শক্তিশালী কম্পিউটিং চিপ ব্যবহারে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু সুবিধা রয়েছে। অন্যদিকে উৎপাদনশিল্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং বাস্তব কর্মক্ষেত্রে রোবট পরীক্ষা করার সুযোগকে কাজে লাগাতে চাইছে চীন।
রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পদ্ধতি নিয়েও চলছে প্রতিযোগিতা। কোথাও মানুষকে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করিয়ে সেই অভিজ্ঞতা রোবটের মধ্যে যুক্ত করা হচ্ছে। আবার কোথাও বিশেষ সেন্সর ও কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে রোবটকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কাজ করার উপযোগী করে তোলা হচ্ছে।
ইতিমধ্যে চীনের কিছু প্রতিষ্ঠানে বাস্তব কাজেও রোবট ব্যবহার শুরু হয়েছে। ব্যাটারি উৎপাদন কারখানায় তার সংযোগের মতো সূক্ষ্ম কাজ করছে কিছু রোবট। সাংহাইয়ের কয়েকটি ফার্মেসিতে ওষুধের অর্ডার ব্যবস্থাপনাতেও ব্যবহার করা হচ্ছে এ প্রযুক্তি।
তবে এই অগ্রগতির পথে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। উন্নতমানের এনভিডিয়া চিপের সংকট, প্রশিক্ষণের জন্য মানসম্মত তথ্য সংগ্রহ এবং অপরিচিত পরিবেশে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন এখনো বড় বাধা। কম্পিউটার সিমুলেশনে সফল হলেও বাস্তব পরিবেশে একই দক্ষতা দেখানো সব সময় সম্ভব হচ্ছে না।
চীনের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রির প্রতিষ্ঠাতা ওয়াং শিংশিংয়ের মতে, ভবিষ্যতে আরও উন্নত এআই মডেল রোবট প্রযুক্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। তার ধারণা, আগামী বছর নতুন প্রজন্মের এআই মডেল এ খাতে বড় অগ্রগতি নিয়ে আসতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রদর্শনীতে চমকপ্রদ পারফরম্যান্স দেখানো আর বাস্তব কর্মক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করা এক বিষয় নয়। অপরিচিত পরিবেশে মানুষের নির্দেশ বুঝে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে পারলেই রোবটের প্রকৃত সক্ষমতা প্রমাণিত হবে।
সব মিলিয়ে চীনের রোবট শিল্পে এখন প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। মানুষের মতো চলাফেরা করার পর এবার মানুষের মতো পরিস্থিতি বোঝা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনই তাদের পরবর্তী লক্ষ্য।