News update
  • কোনো ষড়যন্ত্র দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারবে না : প্রধানমন্ত্রী     |     
  • সৌদির সড়কে একসঙ্গে ঝরলো ৭ বাংলাদেশির প্রাণ     |     
  • হাম উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু     |     
  • নেতাকর্মীদের সঙ্গে পায়ে হেঁটে সার্বভৌমত্ব র‌্যালিতে প্রধানমন্ত্রী     |     
  • গ্রাম পুলিশের বেতন বাড়িয়েছে সরকার, আজ থেকেই কার্যকর     |     
সাহিত্য ও সাময়িকী ডেস্ক প্রথম পাতা 2026-11-02, 7:25am

‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’র অমর কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক

abu-ishak-cf2ed40591dbfcb72d6ea809980489d51793582709.jpg


আবু ইসহাক বাংলা কথাসাহিত্যের একজন বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। গ্রামীণ জনজীবন, সমাজবাস্তবতা, মানুষের দুঃখ-কষ্ট, জীবনসংগ্রাম এবং সামাজিক বৈষম্য তাঁর সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য। সহজ, সাবলীল ভাষা ও বাস্তবধর্মী বর্ণনার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন।

জন্মশতবর্ষে স্মরণ

২০২৬ সালের ১ নভেম্বর ছিল তাঁর জন্মের ১০০ বছর পূর্তি। ১৯২৬ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন মাদারীপুর জেলার (বর্তমান শরীয়তপুর) নড়িয়া উপজেলার শিরঙ্গল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবু ইসহাক। তাঁর বাবা মোহাম্মদ এবাদুল্লাহ এবং মা আতহারুন্নিসা। ২০০৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

সাহিত্যজীবনের শুরু

আবু ইসহাকের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে আলোচিত সৃষ্টি ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’। অল্প বয়সে লেখা এই উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। উপন্যাসটি ১৯৫৫ সালে কলকাতা থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

উপন্যাসটির পটভূমিতে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দেশভাগের সময়কার পূর্ব বাংলার গ্রামীণ সমাজ। দারিদ্র্য, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম এতে বাস্তবসম্মতভাবে উঠে এসেছে।

এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জয়গুন। স্বামী পরিত্যক্তা ও অসহায় এই নারী সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করেন। সমাজের নানা বাধা, দারিদ্র্য এবং মানুষের কুসংস্কার তার জীবনকে কঠিন করে তোলে। জয়গুনের জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে লেখক তৎকালীন গ্রামীণ সমাজে নারীর অবস্থান ও অসহায়ত্বের চিত্র তুলে ধরেছেন।

উপন্যাসটির বিশেষত্ব হলো, লেখক কোনো কৃত্রিম আবেগ বা অতিরঞ্জনের আশ্রয় নেননি। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অভাব-অনটন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক বাস্তবতাকে তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করেছেন।

উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম

‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ ছাড়াও আবু ইসহাকের উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ ও ‘জাল’। তাঁর গল্পগ্রন্থের মধ্যে ‘হারেম’ ও ‘মহাপতঙ্গ’ উল্লেখযোগ্য।

‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ উপন্যাসে পদ্মার চরাঞ্চলের মানুষের জীবন, প্রকৃতির সঙ্গে তাদের লড়াই, জীবিকা এবং সামাজিক সম্পর্কের নানা দিক উঠে এসেছে। অন্যদিকে ‘জাল’ রহস্যধর্মী উপন্যাস হিসেবে পরিচিত।তাঁর সাহিত্যকর্মের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও প্রতিটি রচনায় বিষয় নির্বাচন, চরিত্র নির্মাণ এবং সমাজ পর্যবেক্ষণের বিশেষ দক্ষতা লক্ষ করা যায়।

অভিধান রচনায় অসামান্য অবদান

কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি পেলেও বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রেও আবু ইসহাকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাঁর দীর্ঘদিনের শ্রমের ফসল ‘সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান’।

দুই খণ্ডে প্রকাশিত এই অভিধানের প্রথম খণ্ড বের হয় ১৯৯৩ সালে এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১৯৯৮ সালে। অভিধানটির বিশেষত্ব হলো, এতে শব্দের অর্থের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সমার্থক শব্দ সংকলন করা হয়েছে। যেমন ‘অন্ধকার’ শব্দের ১২৭টি সমার্থক শব্দের উল্লেখ রয়েছে। বাংলা ভাষার গবেষক, শিক্ষার্থী ও লেখকদের কাছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

চলচ্চিত্রেও অমর ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’

আবু ইসহাকের সাহিত্যকর্ম শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’ অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে একই নামের চলচ্চিত্র। মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী পরিচালিত চলচ্চিত্রটি ১৯৭৯ সালে মুক্তি পায়।

চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অর্জন করে। গ্রামীণ সমাজের দারিদ্র্য, কুসংস্কার ও নারীর জীবনসংগ্রাম চলচ্চিত্রটিতেও শক্তিশালীভাবে ফুটে ওঠে। এর মাধ্যমে আবু ইসহাকের সাহিত্যকর্ম আরও বৃহত্তর দর্শকসমাজের কাছে পৌঁছে যায়।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

সাহিত্য ও ভাষার ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আবু ইসহাক জীবনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে:

১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার।১৯৮১ সালে সুন্দরবন সাহিত্যপদক।১৯৯০ সালে বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ সাহিত্য পদক।১৯৯৭ সালে একুশে পদক।২০০৪ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক।এ ছাড়া ২০০৬ সালে মরণোত্তর শিশু একাডেমি পদকেও ভূষিত হন তিনি।

সাহিত্যে তাঁর উত্তরাধিকার

বাংলা সাহিত্যে আবু ইসহাকের গুরুত্ব কেবল ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’র রচয়িতা হিসেবে নয়। তিনি এমন একজন কথাশিল্পী, যিনি ইতিহাসের বড় বড় ঘটনাকে সাধারণ মানুষের জীবনের মধ্য দিয়ে দেখেছেন। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ কিংবা দেশভাগের মতো ঐতিহাসিক বাস্তবতা তাঁর লেখায় উঠে এসেছে গ্রামীণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস শুধু রাজা, শাসক কিংবা রাজনৈতিক ঘটনাবলির বিবরণ নয়। ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সাধারণ মানুষের জীবন, তাদের দুঃখ-কষ্ট, স্বপ্ন, বেঁচে থাকার লড়াই এবং সামাজিক অবস্থান।

২০২৬ সালে তাঁর জন্মশতবর্ষ বাংলা সাহিত্যের এই গুরুত্বপূর্ণ লেখককে নতুন করে পাঠ ও মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর রচনাগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং সাহিত্যচর্চায় সেগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরা প্রয়োজন।

আবু ইসহাক ২০০৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু ‘সূর্য-দীঘল বাড়ী’, ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’ এবং তাঁর অভিধানকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকীর্তি বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।