
ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব মুহাম্মদ কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, দাসত্বের সাংবাদিকতা মানুষ মনে-প্রাণে ঘৃণা করে। ১৭ বছর আমরা অনেক সাংবাদিককে দাসত্বের সাংবাদিকতা করতে দেখেছি। এই কারণে ফ্যাসিবাদী শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, সাংবাদিকদের মর্যাদাও অনেকাংশে ম্লান হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দলীয় ব্যানারের আড়ালে ক্ষমতার সাথে আঁতাত করে জনগণের স্বার্থ বিসর্জন যারা দিয়েছে, তারা আজকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, কেউ লজ্জায় জনসম্মুখে আসতে পারছেন না। এখান থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। ৫ আগস্ট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে শিখিয়ে গেছে— সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে হবে। এটাই সাংবাদিকের কাজ, সেটাই যেন আমরা করি।
আজ দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হলে সাংবাদিকদের কল্যাণে করণীয় বিষয়ক মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন যৌথভাবে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা’র সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল বাছির (বাছির জামাল)।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকতা হচ্ছে সত্যের আরাধনা। সাংবাদিকরা মানুষের পক্ষে দাঁড়ায় একেবারে নিজ থেকে, সেজন্য কোনো বিনিময় দেওয়া লাগে না। আইনজীবী, কৃষিবিদ, ইঞ্জিনিয়ারদের কাছে যান— সেবার বিনিময়ে টাকা দিতে হয়। সাংবাদিকদের সেটা দিতে হয় না। যদিও আজ কোথাও কোথাও পেশাদারিত্বের অবনমন ঘটেছে। তাই সাংবাদিকতাকে আমি কোনো পেশা মনে করি না, এটি একটি মিশন, যার কাজ হচ্ছে ক্ষমতার মুখে সত্য উচ্চারণ করা।
তিনি আরও বলেন, জনগণের আস্থা হারানো মানেই সাংবাদিকতার মৃত্যু। সাংবাদিকতা কোনো মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা নয়। এটি একটি মিশন, পবিত্র কাজ। এই কথাগুলো আমাদের মনে রাখতে হবে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য— অপসাংবাদিকতা ও হলুদ সাংবাদিকতা আজকে ছেয়ে গেছে।
বাসস এমডি বলেন, সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে সত্য খুঁজে বের করা, সেই সত্যকে রক্ষা করা। সত্য না থাকলে আস্থা থাকে না। আস্থা না থাকলে গ্রহণযোগ্যতাও থাকে না। তাই সাংবাদিকতা হতে হবে পুরোটা সত্য, এখানে মিথ্যা বা অর্ধ সত্যের কোনো স্থান নেই। আমাদের মনে রাখতে হবে— দেশের জনগণ ছাড়া কোনো দল-মতের কাছে সংবাদ মাধ্যমের দায়বদ্ধতা নেই। কিন্তু, গত ১৭ বছর সত্যনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা আমরা পাইনি। আমরা পেয়েছি দাসত্বের সাংবাদিকতা। গুম ও খুন হয়েছে, তার সত্য খবরগুলো গণমাধ্যমে পাইনি। আয়নাঘরের খবর বাংলাদেশের কোনো গণমাধ্যমে আসেনি। অথচ বিদেশের গণমাধ্যমে আয়নাঘরের নিউজ আমরা দেখেছি।
সাংবাদিকদের জন্য দশম ওয়েজবোর্ডের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। গার্মেন্টস কর্মীদেরও বৃদ্ধি হবে। অতীতে সকল সময়ে যখনই সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করা হয় একই সময়ের আগে-পরে সাংবাদিকদেরও বেতন বৃদ্ধি করা হয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সরকার খুব শিগগিরই দশম ওয়েজবোর্ড ঘোষণা করবে।
ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন নিয়ে সংবাদপত্র মালিকরা ভাঁওতাবাজি করেন উল্লেখ করে বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, রাষ্ট্র ওয়েজবোর্ড ঘোষণা করে, বড় বড় কয়েকটি পত্রিকা ছাড়া ৯০ শতাংশ পত্রিকা ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন দেয় না। অথচ তারা ঘোষণা দেন, আমরা সরকার ঘোষিত ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন দিচ্ছি। সেই হারে তারা সরকারের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র নেয়। যে মালিকরা ওয়েজবোর্ড দিচ্ছেন বলে বিজ্ঞাপন ও ক্রোড়পত্র নেন, অথচ সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন দেন না, তাদের চেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক, অপরাধী, দুর্নীতিবাজ আর কেউ হতে পারে না।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতাবিরোধী অনেকগুলো কালা কানুন শেখ হাসিনা করে গেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে আমি আহ্বান জানাচ্ছি, এসব কালা কানুন অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। আমরা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলি, আমরা মানুষকে উপদেশ দিই, সবচেয়ে বড় নিপীড়নটা হয় সাংবাদিকদের ওপর। তার মধ্যে মফস্বল সাংবাদিকরাই বেশি ভুক্তভোগী। মফস্বল সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন দিতে হবে। ওয়েজবোর্ডে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ সাংবাদিকদের আবাসন ও কল্যাণে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও পরবর্তীতে মরহুমা খালেদা জিয়ার সরকার নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। আমরা আশা করব, তাঁদের উত্তরসূরি সরকার একইভাবে সাংবাদিকদের পাশে থাকবেন।
সাংবাদিকদের জন্য সুরক্ষা নীতিমালা দাবি করে তিনি বলেন, আমাদের একটি আহ্বান থাকবে— শুধু সংবাদ প্রকাশের কারণে আদালতের অনুমতি ছাড়া সাংবাদিকদের গ্রেফতার করা যাবে না। তবে হলুদ সাংবাদিক বা চাঁদাবাজদের কথা বলছি না। সাংবাদিকদের জন্য একটি ভয়হীন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেটা এখন আছে। এখন সাংবাদিকরা নির্বিঘ্নে লিখতে পারছেন। এমন স্বাধীনতা সাংবাদিকরা অতীতে পেয়েছেন কি না আমার জানা নেই। আমরা যেন এই স্বাধীনতার অপব্যবহার না করি। সেদিকে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।
চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমানের সঞ্চালনায় মতবিনিময় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ শাহনওয়াজ, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহিদুল করিম কচি, সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা মুরাদ, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালী, বান্দরবান প্রেস ক্লাবের সভাপতি নাছির উদ্দিন, খাগড়াছড়ি প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এইচ এম প্রফুল্ল, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য আমিনুল ইসলাম, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক মিয়া মোহাম্মদ আরিফ, সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম শিল্পী, কামরুল হুদা, ইমরান এমি ও বাকি বিল্লাহ।