
ফ্রান্সে মশাবাহিত ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের সংক্রমণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটিতে স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত ১৪৫ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ১৯৬০-এর দশকে দেশটিতে ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পর এক বছরে এত বেশি মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা আর ঘটেনি। সংক্রমণ দক্ষিণাঞ্চল ছাড়িয়ে রাজধানী প্যারিসের আশপাশের এলাকাসহ দেশের উত্তর দিকেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা সান্তে পাবলিক ফ্রান্সের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪৫ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ২৮ জন বেশি। আক্রান্তদের মধ্যে ২৩ জন প্যারিস অঞ্চলের সাতটি প্রশাসনিক বিভাগে শনাক্ত হয়েছেন। গত বছর এ অঞ্চলে সংক্রমিত হয়েছিলেন মাত্র ছয়জন।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম ল্য মোঁদের ৩ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে দেশটিতে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়লেও ২০২৬ সালের পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে দেশটিতে ৬২ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং প্রথমবারের মতো এ ভাইরাসে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এর আগে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে প্রতিবছর প্রায় ৪০ জন করে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরের গ্রীষ্মে তীব্র তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে পাখি এবং মশার জন্য সহজলভ্য পানির উৎস কমে যায়। এতে উভয় প্রাণী একই জলাশয় বা পানির উৎসের আশপাশে জড়ো হতে বাধ্য হয়। ফলে সংক্রমিত পাখি থেকে মশার শরীরে এবং পরে মশার মাধ্যমে মানুষের শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বেড়ে যায়।
গ্রীষ্মের তীব্র গরম কমে যাওয়ার পর সেপ্টেম্বরে কয়েক দফা বৃষ্টি ও বজ্রঝড় হয়। একই সঙ্গে তাপমাত্রাও তুলনামূলক বেশি থাকায় মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। সাধারণত গ্রীষ্মে মশার উপদ্রব বেশি থাকলেও এবার উষ্ণ আবহাওয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় শরৎকালেও মশার সক্রিয়তা বেড়েছে।
মন্টপেলিয়ের বিশ্ববিদ্যালয় ও ফ্রান্সের জাতীয় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইনসার্ম) ভাইরাসবিদ ইয়ানিক সিমোনিনের মতে, উষ্ণ তাপমাত্রা মশার বংশবৃদ্ধির গতি বাড়ায়। পাশাপাশি মশার শরীরে ভাইরাসের বিকাশ ও লালাগ্রন্থিতে পৌঁছানোর সময় কমিয়ে দেয়। ফলে সংক্রমিত মশা দ্রুত অন্য প্রাণী বা মানুষকে ভাইরাসে আক্রান্ত করতে পারে।
গবেষকদের ধারণা, ২০২৪ সালে ইউরোপে ভাইরাসটির নতুন একটি ধরন বা লিনিয়েজের আবির্ভাবও সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটির প্রভাব কতটা, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস মূলত পাখির শরীরে ছড়ায়। সংক্রমিত পাখির রক্ত পান করার সময় কিউলেক্স প্রজাতির মশা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। পরে ওই মশা মানুষকে কামড়ালে ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ফ্রান্সে এ সংক্রমণের জন্য দায়ী প্রধান মশা কিউলেক্স পিপিয়েন্স, যা সাধারণ মশা হিসেবে পরিচিত। বাঘা মশা বা এডিস মশা এ ভাইরাসের প্রধান বাহক নয়।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আক্রান্ত মানুষের শরীর থেকে সাধারণ মশার মাধ্যমে অন্য মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে রক্ত ও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে।
ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে আক্রান্তদের অধিকাংশের শরীরে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ল্য মোঁদের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ সংক্রমণ উপসর্গহীন। প্রায় ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, ফুসকুড়ি ও চোখের সমস্যার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তবে প্রায় ১ শতাংশ আক্রান্তের ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর স্নায়বিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস, মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জুর আবরণে প্রদাহ এবং অন্যান্য স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। গুরুতর আক্রান্তদের প্রায় অর্ধেকের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক, মানসিক বা কার্যক্ষমতাসংক্রান্ত জটিলতা থেকে যেতে পারে। বয়স্ক ও রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম এমন ব্যক্তিদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
ইউরোপজুড়েও এ ভাইরাসের সংক্রমণ উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০২৬ সালে ইউরোপে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসে ৮০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর অধিকাংশই ইতালিতে ঘটেছে বলে ল্য মোঁদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস প্রতিরোধে মানুষের জন্য অনুমোদিত কার্যকর টিকা কিংবা নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা এখনো নেই। এ কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। গুরুতর রোগীদের হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
ইউরোপের একটি গবেষণা কর্মসূচিতে এ ভাইরাসের টিকা তৈরির কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা জানিয়েছেন, কর্মসূচিটি ২০২৭ সালে প্রাক্-ক্লিনিক্যাল পর্যায়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি আগে থেকে ব্যবহৃত কিছু অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের চিকিৎসায় কাজে লাগানো যায় কি না, তা নিয়েও গবেষণা চলছে।
সংক্রমণ বাড়ায় রক্ত ও অঙ্গদানের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে ভাবছে ফ্রান্স। যেসব এলাকায় সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে, সেখানে রক্তের নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ভাইরাসটির বিস্তার বাড়তে থাকায় পরীক্ষার পরিধি ও নজরদারি আরও সম্প্রসারণের প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় কামার্গ এলাকায় পাখির শরীরে উসুতু ভাইরাসের উপস্থিতিও নজরে এসেছে গবেষকদের। দুই বছর ধরে আড়াই হাজার পাখির নমুনা পরীক্ষা করে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের তুলনায় তিন গুণ বেশি উসুতু ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এ ভাইরাসও জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী গরম, খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত মশাবাহিত রোগের বিস্তারের পরিবেশ তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শুধু মশার বিস্তার নয়, পাখির মতো বাহক প্রাণীর সঙ্গে মশার সংস্পর্শও বাড়তে পারে। ফ্রান্সের এবারের সংক্রমণ পরিস্থিতি ইউরোপে জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
সূত্র: ল্য মোঁদ, সান্তে পাবলিক ফ্রান্স ও ইউরোপীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।