
ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে কঠোর বার্তা দিয়ে সতর্ক করেছে যে, তারা যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক হামলা থেকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। একই সঙ্গে ইরান কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার আহ্বানও জানিয়েছে।
আলোচনা সম্পর্কে অবগত একাধিক ইরানি কর্মকর্তা, উপসাগরীয় সূত্র এবং একজন আঞ্চলিক কূটনীতিকের বরাতে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেহরান একটি সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মাধ্যমে সৌদি আরব, কাতার, ওমানসহ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ আরব মিত্রদের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছে যে, ওয়াশিংটন যদি নতুন করে ইরানে হামলা চালায়, তবে এর প্রতিক্রিয়ায় শুধু মার্কিন সামরিক স্থাপনাই নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত জ্বালানি ও অবকাঠামোও হামলার মুখে পড়তে পারে।
ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সতর্কবার্তায় তেলক্ষেত্র, শোধনাগার, বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি শোধনাগার, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থাপনাকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের দাবি, উপসাগরজুড়ে বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখাই এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য।
সূত্রগুলো বলছে, ২৮ জুলাই ট্রাম্প ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হামলার হুমকি দেওয়ার পরই এই কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়। এরপর উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন আঞ্চলিক নেতাদের কাছে তেহরানের বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়।
এ সময় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সৌদি আরব, তুরস্ক ও কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের পাশাপাশি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সঙ্গেও কথা বলেন। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রতিটি বৈঠক ও ফোনালাপে আরাকচির মূল বার্তা ছিল—ওয়াশিংটনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে ট্রাম্পকে নতুন হামলা থেকে বিরত রাখতে হবে।
একজন আঞ্চলিক কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, আরাকচি স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরান প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুত থাকলেও তারা বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ চায় না। বরং উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক সমাধানই সবচেয়ে কার্যকর পথ বলে মনে করে তেহরান।
উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি সূত্র জানায়, ইরানের বার্তাটি ছিল "দ্ব্যর্থহীন"। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তাহলে তার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালানো হবে। বিশ্লেষকদের মতে, এভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক ঝুঁকিকে কূটনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে ইরান।
এদিকে সূত্রগুলোর দাবি, ইরানের বার্তা পাওয়ার পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি সম্ভাব্য সামরিক অভিযান বিলম্বিত করা, আলোচনা পুনরায় শুরু করা, যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করার আহ্বান জানান।
আরেকটি উপসাগরীয় সূত্রের মতে, সতর্কবার্তাটি সব উপসাগরীয় দেশের উদ্দেশে পাঠানো হলেও মূলত সৌদি আরব ও কাতারের মাধ্যমে তা পৌঁছে দেওয়া হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পর সেই কূটনৈতিক যোগাযোগকেই কাজে লাগিয়েছে তেহরান।
দ্বিতীয় এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, কাতার, ওমান ও সৌদি আরব—তিন দেশই ওয়াশিংটনকে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করতে এবং নতুন সংঘাত এড়াতে উৎসাহিত করেছে। এর আগে ইরান সতর্ক করে বলেছিল, যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে "অগ্নিগোলকে" পরিণত করতে পারে।
তবে উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। গত ২ আগস্ট তিনি বলেন, "দ্রুত একটি চুক্তি সম্ভব হলে" তিনি ইরানের ওপর পরিকল্পিত হামলা থেকে সরে আসতে প্রস্তুত। ফলে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি নতুন করে আলোচনার সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স