
ছবি: সংগ্রহীত
পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য সচল করতে ইরান ও ওমান একটি নীতিগত সমঝোতায় পৌঁছানোর কাছাকাছি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থায় থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ খুলে দেওয়ার উদ্যোগ সফল হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরতে পারে।
প্রস্তাবিত সমঝোতার আওতায় বর্তমানে ব্যবহৃত অস্থায়ী উত্তর ও দক্ষিণ নৌপথের পরিবর্তে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে একটি একক ‘মিডল করিডোর’ বা মধ্যবর্তী নৌপথ চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলো ইরানের জলসীমা ব্যবহার করবে এবং উপসাগর থেকে বেরিয়ে আসা জাহাজগুলো ওমানের জলসীমা দিয়ে চলাচল করবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সমঝোতার প্রথম ৬০ দিনের মধ্যে নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এর প্রথম ৩০ দিনে ইরান ও ওমান যৌথভাবে সম্ভাব্য নৌ-মাইন, বিস্ফোরক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু শনাক্ত ও অপসারণের কাজ করবে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে নৌপথ পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার কথা রয়েছে।
প্রাথমিক দুই মাস হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কোনো ট্রানজিট ফি না নেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। পরবর্তী সময়ে নৌপথের নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যয় মেটাতে বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ‘সেবামূল্য’ বা ফি নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
জ্বালানি বাজারে চাপ কমাতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র
হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করার উদ্যোগের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের পরিস্থিতিও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথ হওয়ায় হরমুজ প্রণালীতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম—সবকিছুর ওপরই চাপ তৈরি হতে পারে।
সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানির মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখাও ওয়াশিংটনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণে ইরান ও ওমানের মধ্যে সমঝোতা হলে যুক্তরাষ্ট্রও নিষেধাজ্ঞা ও সামুদ্রিক অবরোধসংক্রান্ত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে পারে বলে আলোচনায় এসেছে।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালীর পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের বক্তব্যেও এ বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁদের মতে, শুধু নৌপথ খুলে দেওয়া নয়, দীর্ঘমেয়াদে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কৌশলগত সমীকরণ
হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরান, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি হওয়ার খবরও সামনে এসেছে। ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠার আলোচনা শুরু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন কোনো প্রতিরক্ষা সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোয় এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল, জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যপথকে ঘিরে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাস রপ্তানির বড় একটি অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছে। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জ্বালানি বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।
ইরান ও ওমানের প্রস্তাবিত সমঝোতা বাস্তবায়িত হলে হরমুজ প্রণালীতে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে ইরান, ওমান, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পারস্পরিক আস্থার ওপর।
ফলে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতা শুধু একটি নৌপথ পুনরায় খোলার উদ্যোগ নয়; বরং এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন ভারসাম্য তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।