
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও নন্দিত নায়িকা ববিতার জন্মদিন আজ। ১৯৫৩ সালের ৩০ জুলাই যশোরে জন্মগ্রহণ করেন চলচ্চিত্রের এই গুণী শিল্পী। আজ তিনি ৭৩ বছরে পা রাখলেন।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ববিতা বাংলা চলচ্চিত্রে অসংখ্য কালজয়ী চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। মিষ্টি হাসি, অনবদ্য অভিনয়শৈলী ও স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি খুব অল্প সময়েই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
ববিতার প্রকৃত নাম ফরিদা আক্তার পপি। চলচ্চিত্রে তার অভিষেক ঘটে ষাটের দশকের শেষ দিকে। জহির রায়হানের ‘সংসার’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের পর ধীরে ধীরে তিনি নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। তবে তার অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আসে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে। এই সিনেমায় ‘অনঙ্গ বউ’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত হয়।
ববিতা শুধু জনপ্রিয় নায়িকাই নন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একজন গুরুত্বপূর্ণ অভিনেত্রী হিসেবেও বিবেচিত। পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে তিনি শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘অশনি সংকেত’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘নয়নমণি’, ‘বসুন্ধরা’, ‘সূর্যগ্রহণ’সহ আরও বহু দর্শকনন্দিত সিনেমা।
অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ববিতা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেছেন। তাঁর অভিনয়জীবনের সাফল্য ও অবদানের কারণে তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছেন।
জন্মদিনে চলচ্চিত্রাঙ্গনের সহকর্মী, ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ববিতাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনের স্মৃতি ও অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ববিতা আজও দর্শকের ভালোবাসায় অমলিন।
জন্মদিনে কিংবদন্তি এই অভিনেত্রীর প্রতি রইল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও সুন্দর জীবন কামনা করছেন অগণিত ভক্ত-অনুরাগী।
বিশেষ এই দিনটি নিয়ে দেশের একটি সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
ববিতা বলেন, ‘আমার একমাত্র ছেলে অনীক বেশ কয়েক বছর ধরে কানাডায় থাকে। আমি চেষ্টা করি প্রতিবছর জন্মদিনে ছেলের সঙ্গে সময় কাটাতে, তার পাশে থাকতে। এবারও তা-ই করেছি।’
তিনি বলেন, ‘জন্মদিন ছেলের সঙ্গেই কাটাব। নিশ্চয়ই সে আমার জন্য কোনো সারপ্রাইজ (চমক) রেখেছে, যদিও এখনো আমাকে কিছু বলেনি। বড় কথা হচ্ছে, মা ও ছেলে একসঙ্গে জন্মদিন উদ্যাপন করব, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আনন্দের। বয়স তো বাড়ছে, এক দিন হয়তো কেউই থাকব না।’
বিশেষ এই দিনে ছেলের পছন্দের খাবার রান্না করবেন ববিতা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘অনীক যেসব খাবার পছন্দ করে, সেসবই রান্না করব। সময় পেলে কোথাও গিয়ে একটু সময় কাটাব।’
আগামী ২ আগস্ট ববিতা তার ছেলে অনীককে নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় যাবেন। সেখানকার মেয়রের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেবেন তিনি। এর পাশাপাশি লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘আনন্দমেলা অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’-এ তাকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হবে।
এ নিয়ে ববিতা বলেন, ‘সারা জীবন চলচ্চিত্রেই অভিনয় করেছি। অভিনয় ছাড়া আর কিছুই করিনি। দেশে-বিদেশে আগেও অনেক পুরস্কার পেয়েছি। এবার আমেরিকায় আমাকে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হবে। এটি আমার জন্য ভীষণ আনন্দের। আমার অনেক ভালো লাগছে যে সারা জীবনের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তারা আমাকে এই সম্মাননা দিচ্ছেন।’
ববিতা আরও বলেন, ‘ক্যালিফোর্নিয়ার মেয়রের সঙ্গে ডিনারে অংশগ্রহণ করাটাও অনেক আনন্দের। এই ঘটনা আমার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে যাব। পরে ছেলেকে নিয়ে ঘুরে বেড়াব। জীবনের ডায়েরিতে সুন্দর কিছু স্মৃতি জমা থাকবে।’
বরেণ্য এই অভিনয়শিল্পী বলেন, ‘দেখুন, মানুষ আমাকে ভালোবাসেন, সম্মান করেন—এটা আমার জন্য অনেক বড় বিষয়। আমি মনে করি, একজন শিল্পীর জন্য সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো মানুষের এই ভালোবাসা।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘একসময় সিনেমা নিয়ে অনেক ব্যস্ত ছিলাম। সিনেমা নিয়ে দেশের বাইরে অনেক বড় বড় চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেসব উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমাকে তুলে ধরেছি, নিজের দেশকে তুলে ধরেছি। কাজেই চলচ্চিত্রের শক্তি অনেক বড়। চলচ্চিত্র দিয়ে অনেক ভালো কিছু করা সম্ভব।’
ববিতা বলেন, ‘আমি অনেক কষ্ট করেছি। অনেক ভালো ভালো সিনেমায় কাজ করার জন্য একটি পয়সাও পারিশ্রমিক নিইনি। ওই সিনেমাগুলো দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছে, প্রশংসা পেয়েছে, পুরস্কার পেয়েছে এবং শিল্পী হিসেবে আমাকে অনেক ভালো একটা জায়গা করে দিয়েছে।’
অভিনয়জীবনে অনেক নায়কের বিপরীতে কাজ করেছেন ববিতা। নায়ক জাফর ইকবাল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জাফর ইকবাল খুব স্মার্ট ছিলেন। তিনি এতটাই আধুনিক ও স্মার্ট ছিলেন যে ওই সময়ে সেটা অনেককেই অবাক করত। তার সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল, আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। জাফর ইকবালের পরিবার তো খুবই সংস্কৃতিমনা, শাহনাজ রহমতউল্লাহ তার বোন। জাফর ইকবাল নিজেও খুব ভালো গান করতে পারতেন। শুটিংয়ের অবসরে তিনি আমাকে বলতেন, “ম্যাডাম আজ আপনাকে গান শোনাব।”
জাফর ইকবালকে নিয়ে ববিতা আরও বলেন, ‘নায়ক জাফর ইকবাল আমাকে গিটার বাজিয়ে গান শোনাতেন। তার সঙ্গে আমার খুব সুন্দর সম্পর্ক ছিল। আজ তিনি নেই। আসলে সব নায়কের সঙ্গেই আমার সুন্দর সম্পর্ক ছিল। রাজ্জাক ভাই থেকে শুরু করে জাফর ইকবালসহ সব নায়কের সঙ্গেই খুব সুন্দরভাবে কাজ করেছি।’