News update
  • ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২০০ ছাড়াল, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৮৬৬     |     
  • স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামী বছরের প্রথম দিকে শুরু: মীর শাহে আলম     |     
  • বিশ্ববাজারে আরও কমলো জ্বালানি তেলের দাম     |     
  • পাসপোর্ট হারালে দ্বিতীয়বার থেকে জরিমানা ১০ হাজার টাকা     |     
সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ও সাময়িকী 2026-09-14, 8:12am

ব্যঙ্গের আয়নায় সমাজের মুখ দেখিয়েছিলেন আবুল মনসুর আহমদ

abul-mansurs-book-d06384875b3907f2ea32c726d0dd52221789351953.jpg


বাংলা সাহিত্যে ব্যঙ্গরচনাকে সমাজবাস্তবতার তীক্ষ্ণ হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে যাদের অবদান অনস্বীকার্য, আবুল মনসুর আহমদ তাদের অন্যতম। সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনীতিক-বহুমাত্রিক পরিচয়ের এই মানুষটি তার লেখায় সমাজ, রাজনীতি, ধর্মীয় কুসংস্কার, মানুষের ভণ্ডামি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। হাসির আবরণে তিনি পাঠকের সামনে হাজির করেছেন সমাজের গভীর অসংগতি ও বেদনাদায়ক বাস্তবতা।


আবুল মনসুর আহমদ ১৮৯৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ মার্চ ঢাকায় তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ জীবনে তিনি উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক শাসন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা, ভাষা ও স্বাধিকার আন্দোলন এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। এসব অভিজ্ঞতা তার সাহিত্য ও রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।


‘আয়না’য় সমাজের প্রতিচ্ছবি


আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্যিক পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক তার ব্যঙ্গরচনা। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আয়না’ বাংলা ব্যঙ্গসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এ গ্রন্থে তিনি কুসংস্কার, সামাজিক ভণ্ডামি ও মানুষের নানা দুর্বলতাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যাতে পাঠক হাসতে হাসতে নিজের সমাজের অসংগতির মুখোমুখি হন।


‘আয়না’র বিশেষত্ব হলো এখানে ব্যঙ্গ শুধু হাস্যরস সৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত হয়নি। সমাজের প্রচলিত অসংগতি ও মানুষের মানসিকতার দুর্বলতাকে পাঠকের সামনে তুলে ধরাই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। ফলে গ্রন্থটি প্রকাশের বহু বছর পরও এর সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।


‘ফুড কনফারেন্স’ ও দুর্ভিক্ষের বাস্তবতা


১৯৪৪ সালে প্রকাশিত ‘ফুড কনফারেন্স’ আবুল মনসুর আহমদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যঙ্গগ্রন্থ। বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে রচিত এই গ্রন্থে তিনি রাজনৈতিক নেতাদের ব্যর্থতা, নীতিহীন ব্যবসায়ী ও তথাকথিত সমাজসেবকদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গ করেছেন। দুর্ভিক্ষের মতো ভয়াবহ মানবিক সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপের পরিবর্তে সভা-সমিতি ও কথার রাজনীতিকে তিনি ব্যঙ্গের লক্ষ্য করেছেন।


গ্রন্থটির নামগল্পে প্রাণীর প্রতীক ব্যবহার করে তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক চরিত্রের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। হাস্যরসের আড়ালে ক্ষুধা, দুর্ভিক্ষ, শোষণ ও ক্ষমতার রাজনীতির নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে। এ কারণেই ‘ফুড কনফারেন্স’ শুধু একটি ব্যঙ্গরচনা নয়, একটি নির্দিষ্ট সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক দলিল হিসেবেও পাঠ করা হয়।


সাংবাদিকতা ও রাজনীতিতেও সক্রিয়


সাহিত্যের পাশাপাশি সাংবাদিকতা ও রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন এবং ১৯৪৬ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইত্তেহাদ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তাকে সমাজ ও রাজনীতির নানা স্তরকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেয়। সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন তার সাহিত্যকর্মেও স্পষ্ট।


রাজনীতির ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। উপমহাদেশের রাজনীতির নানা বাঁক তিনি কাছ থেকে দেখেছেন এবং সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অন্যতম বড় দলিল ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’। ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত এ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে তিনি নিজের দেখা উপমহাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ সময়কে বিশ্লেষণ করেছেন। পরে ‘আত্মকথা’ গ্রন্থেও তার জীবনের নানা অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে।


বহুমাত্রিক সাহিত্যভুবন


আবুল মনসুর আহমদের রচনার পরিধি শুধু ব্যঙ্গসাহিত্যে সীমাবদ্ধ নয়। ‘আসমানী পর্দা’, ‘গালিভারের সফরনামা’, ‘জীবনক্ষুধা’, ‘আবে হায়াত’, ‘সত্যমিথ্যা’সহ বিভিন্ন গ্রন্থে তিনি সমাজ, মানুষ, রাজনীতি ও জীবনকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন।


তার লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সরল ভাষায় গভীর বক্তব্য তুলে ধরা। তিনি পাঠককে সরাসরি উপদেশ না দিয়ে হাস্যরস, কৌতুক ও ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে চিন্তার জগতে নিয়ে যেতেন। ফলে তার রচনায় একই সঙ্গে বিনোদন ও সমাজসচেতনতার উপস্থিতি দেখা যায়।


আজও প্রাসঙ্গিক তার ব্যঙ্গ


আবুল মনসুর আহমদের প্রয়াণের কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও তার ব্যঙ্গরচনার আবেদন কমেনি। সমাজে কুসংস্কার, ভণ্ডামি, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক স্বার্থপরতা কিংবা জনসেবার নামে ব্যক্তিস্বার্থ—এসব প্রবণতা নিয়ে তার রচনাগুলো নতুন করে পাঠের সুযোগ তৈরি করে।


তার সাহিত্য দেখিয়েছে, ব্যঙ্গ শুধু হাসানোর জন্য নয়; এটি সমাজকে আয়না দেখানোর শক্তিশালী মাধ্যম। সেই আয়নায় নিজের সমাজ, রাজনীতি ও চরিত্রের অসংগতি দেখতে বাধ্য করেন আবুল মনসুর আহমদ।


১৯৭৯ সালে তিনি স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক চিন্তায় তার বহুমুখী অবদান তাকে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তার সৃষ্টি ও চিন্তা আজও নতুন প্রজন্মের পাঠককে হাসির আড়ালে সমাজের গভীর বাস্তবতা চিনতে শেখায়।