News update
  • ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২০০ ছাড়াল, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৮৬৬     |     
  • স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামী বছরের প্রথম দিকে শুরু: মীর শাহে আলম     |     
  • বিশ্ববাজারে আরও কমলো জ্বালানি তেলের দাম     |     
  • পাসপোর্ট হারালে দ্বিতীয়বার থেকে জরিমানা ১০ হাজার টাকা     |     
মোহাম্মদ মামুন কবীর ধর্ম ও জীবন 2026-09-14, 8:05am

সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণে প্রশান্তি পায় মুমিনের হৃদয়

allah-soron-d3ba10339b196b015278a439e90631a51789351502.jpg


মানুষের জীবন কখনো সুখে ভরে ওঠে, আবার কখনো নেমে আসে দুঃখ, হতাশা ও নানা সংকট। সাফল্যের সময়ে মানুষ যেমন আনন্দিত হয়, তেমনি ব্যর্থতা ও বিপদের সময়ে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ইসলামে এসব পরিস্থিতিতে মুমিনের জন্য অন্যতম বড় আশ্রয় হলো আল্লাহর স্মরণ বা জিকির। সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে, একাকিত্বে কিংবা কর্মব্যস্ততার মধ্যেও আল্লাহকে স্মরণ করার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম।


পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে...” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৯১)। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর স্মরণ কোনো নির্দিষ্ট সময় বা অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মুমিনের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ রয়েছে।


অন্তরের প্রশান্তির অন্যতম মাধ্যম জিকির


মানুষের বাহ্যিক জীবন যতই স্বচ্ছন্দ হোক, অন্তরে অশান্তি থাকলে প্রকৃত সুখ পাওয়া কঠিন। অর্থ, সম্পদ, চাকরি, ব্যবসা কিংবা সামাজিক মর্যাদা মানুষের বাহ্যিক প্রয়োজন পূরণ করতে পারে; কিন্তু অন্তরের প্রশান্তি আসে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার মাধ্যমে।


আল্লাহ তাআলা বলেন, “জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” (সুরা আর-রাদ, আয়াত ২৮)। তাই দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতার সময়ে একজন মুমিন আল্লাহর দিকে ফিরে যান। তিনি নামাজ আদায় করেন, কোরআন তিলাওয়াত করেন, দোয়া করেন এবং জিকিরের মাধ্যমে নিজের হৃদয়কে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত রাখেন।


সুখের সময়েও আল্লাহকে স্মরণ


বিপদে পড়লে আল্লাহকে স্মরণ করা সহজ হলেও সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে অনেক মানুষ স্রষ্টাকে ভুলে যান। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো—শুধু বিপদের সময় নয়, নিয়ামত পাওয়ার সময়ও আল্লাহকে স্মরণ করতে হবে।


খাবার সামনে এলে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা, খাবার শেষে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা, কোনো ভালো কাজের সুযোগ পেলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা—এসবই আল্লাহর স্মরণের অংশ। একজন মুমিন যখন উপলব্ধি করেন যে জীবনের প্রতিটি নিয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে, তখন তার মধ্যে কৃতজ্ঞতা সৃষ্টি হয়।


বিপদে আল্লাহর ওপর ভরসা


জীবনে বিপদ আসবেই। অসুস্থতা, আর্থিক সংকট, প্রিয়জন হারানো, কর্মক্ষেত্রে ব্যর্থতা কিংবা নানা অনিশ্চয়তা মানুষের জীবনের অংশ। এসব পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে পড়ার পরিবর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা করার শিক্ষা দিয়েছে ইসলাম।


পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।” (সুরা আত-তালাক, আয়াত ৩)।


তাই বিপদের সময় মুমিনের মুখে থাকতে পারে—“হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল”—অর্থাৎ, ‘আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।’ এ ধরনের জিকির মানুষকে বিপদের বাস্তবতা অস্বীকার করতে শেখায় না; বরং সংকট মোকাবিলায় আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে উৎসাহিত করে।


সহজ আমলেই জিকিরের অভ্যাস


আল্লাহর স্মরণ করতে সব সময় দীর্ঘ সময় আলাদা করে বের করা প্রয়োজন হয় না। দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও জিকির করা যায়। হাঁটতে হাঁটতে, গাড়িতে বসে, কাজের বিরতিতে কিংবা ঘুমানোর আগে সহজ কিছু জিকির করা সম্ভব।


মুমিনের জবান হতে পারে—সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আসতাগফিরুল্লাহ। এসব জিকিরের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর মহত্ত্ব, প্রশংসা, একত্ব ও নিজের ভুল-ত্রুটির কথা স্মরণ করে।


বিশেষ করে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। নিজের ভুল উপলব্ধি করে তওবা করা মানুষের আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।


জিকির শুধু মুখের আমল নয়


আল্লাহর স্মরণ মানে শুধু মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ করা নয়। আল্লাহকে স্মরণ করার প্রকৃত অর্থ হলো তাঁর আদেশ-নিষেধ মনে রাখা এবং জীবনের কাজে তা বাস্তবায়ন করা। একজন মানুষ যদি মুখে আল্লাহকে স্মরণ করেন, কিন্তু অন্যায়, প্রতারণা, জুলুম কিংবা মানুষের অধিকার নষ্ট করা থেকে বিরত না থাকেন, তাহলে তার জিকিরের প্রভাব জীবনে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।


তাই জিকিরের পাশাপাশি নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, হালাল-হারাম মেনে চলা, মানুষের প্রতি সদাচরণ এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকা জরুরি।


ব্যস্ত জীবনেও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক


বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি, কর্মব্যস্ততা ও নানা ধরনের দুশ্চিন্তার কারণে মানুষ অনেক সময় নিজের জন্যও সময় পান না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নানা ব্যস্ততা মানুষের মনকে আরও অস্থির করে তুলতে পারে। এমন বাস্তবতায় নিয়মিত জিকির, নামাজ ও কোরআন তিলাওয়াত মানুষের জীবনকে আল্লাহমুখী করতে পারে।


মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহকে শুধু মসজিদে নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে স্মরণ করা। ব্যবসায় সততা, চাকরিতে দায়িত্বশীলতা, পরিবারে ভালো আচরণ, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা এবং মানুষের প্রতি দয়া সবকিছুর মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা থাকা উচিত।


সুখে আল্লাহর শুকরিয়া এবং দুঃখে তাঁর ওপর ভরসা এভাবেই মুমিন জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিকে ইবাদতের সুযোগে পরিণত করতে পারেন।


আল্লাহ তাআলা আমাদের জবানকে তাঁর জিকিরে সিক্ত রাখুন, অন্তরকে প্রশান্ত করুন এবং সুখ-দুঃখ, স্বাচ্ছন্দ্য-বিপদ—জীবনের সর্বাবস্থায় তাঁকে স্মরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।