News update
  • শাহজালাল বিমানবন্দরের বলাকা লাউঞ্জে আগুন     |     
  • ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে যেসব এলাকায়     |     
  • ড্যাব এর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সমাবেশে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান     |     
  • জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে এনসিপির শীর্ষ নেতারা     |     
  • হরমুজ প্রণালী খুলতে ইরান-ওমান সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে     |     
ইমরুল কাওছার, শরিয়তপুর প্রতিনিধি: জাতীয় 2026-08-05, 7:17pm

পদ্মা সেতুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় শরীয়তপুর: উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি কবে হবে বাস্তবতা?

whatsapp-image-2026-08-05-at-2-eb578d9db3f5aba7fa9443ce3433d6151785935873.jpeg


দক্ষিণাঞ্চলের সম্ভাবনাময় জেলা শরীয়তপুর। কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নদীপথ, উর্বর ভূমি এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায়। পদ্মা সেতু চালুর পর সেই সম্ভাবনা আরও বহুগুণ বেড়েছে। রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর নানা সীমাবদ্ধতায় জেলার মানুষ এখনো প্রত্যাশিত উন্নয়নের সুফল পুরোপুরি পাচ্ছেন না।

জেলার মানুষের মতে, পদ্মা সেতু শুধু যাতায়াত সহজ করেনি, শরীয়তপুরকে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হওয়ার সুযোগও সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং দ্রুত বাস্তবায়ন।

স্বাস্থ্যসেবায় বড় ঘাটতি

শরীয়তপুরের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি স্বাস্থ্যসেবা। জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা থাকলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘাটতি দীর্ঘদিনের। ফলে হৃদরোগ, ক্যান্সার, কিডনি, নিউরোলজি কিংবা অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ছুটতে হয়। এতে সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ।

স্থানীয়দের দাবি, শরীয়তপুরে একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও আধুনিক বহুশয্যাবিশিষ্ট বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হলে শুধু জেলার মানুষই নয়, আশপাশের জেলার বাসিন্দারাও উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবেন।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি

কৃষিনির্ভর জেলা হওয়া সত্ত্বেও শরীয়তপুরে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই। উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের রাজধানী বা দেশের অন্য জেলায় যেতে হয়। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন।

বিগত সরকার শরীয়তপুরে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিল। বর্তমানে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কৃষি গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনবল তৈরি এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে পিছিয়ে

পদ্মা সেতুর সুবাদে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হলেও শরীয়তপুরে এখনো বড় কোনো শিল্পাঞ্চল বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। ফলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ-যুবক জীবিকার সন্ধানে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল কিংবা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল, হিমাগার, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলা গেলে শরীয়তপুর দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

যোগাযোগে নতুন স্বপ্ন

শরীয়তপুরবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা—পদ্মা সেতুর সঙ্গে জেলার পূর্ণাঙ্গ যোগাযোগ অবকাঠামো নিশ্চিত করা। পাশাপাশি শরীয়তপুর-চাঁদপুর সংযোগ সেতু নির্মাণের দাবিও দীর্ঘদিনের। এই সেতু বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ১১ জেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে পরিবহন ব্যয় কমবে, ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিও উপকৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে পদ্মা সেতু হয়ে জাজিরা, শরীয়তপুর সদর, ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা ও গোসাইরহাট হয়ে বরিশালের হিজলা পর্যন্ত সম্ভাব্য রেললাইন নির্মাণের উদ্যোগ জেলার মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে দ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাবে।

নড়িয়া সেতু দ্রুত শেষ করার দাবি

নড়িয়া উপজেলার সখিপুর এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, পদ্মা সেতুর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ নিশ্চিত করা। নির্মাণাধীন নড়িয়া সেতুর কাজ দীর্ঘদিন ধরে শেষ না হওয়ায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, সেতুটির কাজ দ্রুত শেষ হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।

মাদক নিয়ন্ত্রণেও প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ

উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন মহলের মতে, মাদকের বিস্তার যুবসমাজের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব নয়।

সময় এখন বাস্তবায়নের

শরীয়তপুরের মানুষ এখন আর শুধু আশ্বাস শুনতে চায় না, তারা দেখতে চায় দৃশ্যমান উন্নয়ন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, আধুনিক হাসপাতাল, শিল্পাঞ্চল, প্রস্তাবিত রেললাইন, শরীয়তপুর-চাঁদপুর সংযোগ সেতু, নড়িয়া সেতুর দ্রুত সমাপ্তি এবং উন্নত সড়ক যোগাযোগ—এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জেলার উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চার হবে।

পদ্মা সেতু শরীয়তপুরের সামনে যে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, তা কাজে লাগানোর এখনই উপযুক্ত সময়। সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগ, জনপ্রতিনিধিদের আন্তরিকতা এবং দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শরীয়তপুর শুধু দক্ষিণাঞ্চলের নয়, দেশের অন্যতম আধুনিক ও সমৃদ্ধ জেলায় পরিণত হতে পারে—এমন প্রত্যাশাই জেলার সর্বস্তরের মানুষের।