
ছবি- সংগৃহীত
চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে বিভাগভেদে প্রকট বৈষম্য ফুটে উঠেছে। বিজ্ঞান বিভাগে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড শীর্ষস্থান দখল করলেও মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের বড় ধসে সারাদেশে গড় পাসের হার নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। শনিবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন আনুষ্ঠানিকভাবে এই ফলাফল ঘোষণা করেন। এবারের পাসের হার গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন; এর আগে ২০০৪ সালে সর্বনিম্ন ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছিল। এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন এবং অকৃতকার্য হয়েছে ৫ লাখ ৯৩ হাজার ১১৩ জন। গত বছর গড় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার মোট ৫ লাখ ৪১ হাজার ২৪৯ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে, যেখানে সম্মিলিত পাসের হার ৫১ দশমিক ৬২ শতাংশ। তবে বিভাগভেদে ফলাফলের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২ লাখ ৯৭ হাজার ৬২১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৯৩০ জন উত্তীর্ণ হয়ে ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ পাসের হার নিয়ে সারাদেশে শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বোর্ড, যার মূল চালিকাশক্তি ছিল বিজ্ঞান বিভাগের ৮১ দশমিক ৮৭ শতাংশ পাসের হার। বিজ্ঞানে ঢাকার পরেই রয়েছে ময়মনসিংহ (৭৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ) ও চট্টগ্রাম বোর্ড (৭৪ দশমিক ৪২ শতাংশ), আর ৫৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ পাসের হার নিয়ে সবার নিচে অবস্থান করছে বরিশাল বোর্ড। মেধাতালিকার শীর্ষেও বিজ্ঞান বিভাগের একচেটিয়া প্রাধান্য দেখা গেছে। সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে জিপিএ-৫ পাওয়া ৩৫ হাজার ৯৪৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৬ হাজার ৭০২ জনই বিজ্ঞানের; বিপরীতে মানবিক বিভাগে ৫ হাজার ৯৭৮ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষায় মাত্র ৩ হাজার ২৬৮ জন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ জিপিএ পেয়েছে।
আঞ্চলিক শিক্ষা বোর্ডগুলোতে এবারের ফলাফল বিপর্যয়ের মূল ধাক্কা গেছে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ওপর দিয়ে। মানবিক বিভাগে সবচেয়ে কম পাসের হার রেকর্ড করা হয়েছে রাজশাহী বোর্ডে, মাত্র ৩৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এর পরই তলানিতে রয়েছে যশোর (৩৮ দশমিক ২১ শতাংশ) ও চট্টগ্রাম বোর্ড (৩৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ), যেখানে ঢাকা বোর্ড ৪৮ দশমিক ২২ শতাংশ পাসের হার নিয়ে মানবিকে শীর্ষে রয়েছে। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগেও একই চিত্র দেখা গেছে—৬০ দশমিক ০৬ শতাংশ পাসের হার নিয়ে ঢাকা প্রথম এবং ৫৪ দশমিক ১৪ শতাংশ নিয়ে চট্টগ্রাম দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও রাজশাহী বোর্ড ৩৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ নিয়ে সবার নিচে রয়েছে। সার্বিক ফলাফলে সাধারণ বোর্ডগুলোর মধ্যে বরিশাল বোর্ড সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে, আর রাজশাহী ও যশোর বোর্ডের গড় পাসের হার ৪৫ শতাংশের ঘরেই আটকে আছে।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের বাইরে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ ও সর্বোচ্চ জিপিএ প্রাপ্তের সংখ্যা ৩ হাজার ২৫০ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ ও সর্বোচ্চ জিপিএ প্রাপ্তের সংখ্যা ৮৮৬ জন। সব বোর্ড মিলিয়ে সারাদেশে মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ ফাইভ পেয়েছে, যা গত বছরের ৬৯ হাজার ৯৭ জনের তুলনায় ২৯ হাজার ১৩ জন কম। এবার সার্বিক পাসের হারে ছাত্রদের (৪৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ) চেয়ে ছাত্রীরা (৫৬ দশমিক ৩১ শতাংশ) এগিয়ে থাকলেও সর্বোচ্চ জিপিএ অর্জনে মেয়েদের (১৯ হাজার ৭২১ জন) চেয়ে ছেলেরা (২০ হাজার ৩৬৩ জন) কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে, শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এবার ১৩৯টি হলেও একজনও পাস করেনি এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত বছরের ২০২টি থেকে ৯১টি বেড়ে ২৯৩টিতে দাঁড়িয়েছে। পাঠদান পদ্ধতি ও শিক্ষার পরিবেশের ঘাটতি স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী মিলন এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের জন্য এক মাসের মধ্যে সম্পূরক পরীক্ষা নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন মেধার প্রকৃত ও নির্মোহ মূল্যায়নের ওপর জোর দিয়ে জানান, আগামী ১ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করা যাবে।