
মহাবিশ্বের শুরুর দিকে প্রথম নক্ষত্র কীভাবে জন্ম নিয়েছিল, কীভাবে অন্ধকার মহাকাশে আলো ছড়িয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে গ্রহ-নক্ষত্র গঠনের উপাদান তৈরি করেছিল, তা অনুসন্ধানে নতুন অগ্রগতি হয়েছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের একদল গবেষক সুপারকম্পিউটারের সাহায্যে মহাবিশ্বের প্রাচীন সময়ের নক্ষত্র ও ছায়াপথের বিবর্তনের অত্যন্ত বিস্তারিত সিমুলেশন তৈরি করেছেন। ‘মেগাট্রন’ নামের এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রথম নক্ষত্রের আলো, গ্যাসের গতিবিধি, রাসায়নিক পরিবর্তন এবং নক্ষত্রের বিস্ফোরণের প্রভাব একসঙ্গে বিশ্লেষণ করছেন।
৩ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত গবেষণাবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সিমুলেশন মহাবিশ্বের প্রথম নক্ষত্র ও ছায়াপথের ইতিহাস বুঝতে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপে দেখা প্রাচীন ছায়াপথগুলোর বৈশিষ্ট্য এবং আমাদের আকাশগঙ্গার আশপাশে থাকা অতি প্রাচীন নক্ষত্রের রাসায়নিক গঠন ব্যাখ্যা করতে এটি সহায়ক হতে পারে।
বিগ ব্যাংয়ের পর মহাবিশ্বের প্রথম দিকের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন। সময়ের সঙ্গে তা প্রসারিত ও শীতল হলে প্রধানত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস তৈরি হয়। কিন্তু তখনো নক্ষত্র, গ্রহ কিংবা বর্তমানের মতো ছায়াপথের অস্তিত্ব গড়ে ওঠেনি। মহাবিশ্বের এই সময়কে জ্যোতির্বিজ্ঞানে ‘কসমিক ডার্ক এজ’ বা মহাজাগতিক অন্ধকার যুগ বলা হয়।
পরবর্তী সময়ে মহাকর্ষের প্রভাবে গ্যাস ঘনীভূত হয়ে প্রথম নক্ষত্রের জন্ম দেয়। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এসব নক্ষত্রকে ‘পপুলেশন থ্রি’ বা তৃতীয় প্রজন্মের নক্ষত্র নামে চিহ্নিত করেন। নামটি শুনে প্রজন্মের ক্রম নিয়ে বিভ্রান্তি হতে পারে; বাস্তবে এগুলোই ছিল মহাবিশ্বের প্রথম দিকের নক্ষত্র। প্রাথমিকভাবে এগুলো হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দিয়ে গঠিত ছিল, কারণ তখন কার্বন, অক্সিজেন, লোহা ও অন্যান্য ভারী মৌল তৈরি হয়নি।
প্রথম নক্ষত্রগুলো থেকে নির্গত অতিবেগুনি রশ্মি আশপাশের গ্যাসকে আয়নিত করতে শুরু করে। এ প্রক্রিয়ায় মহাবিশ্বের নিরপেক্ষ হাইড্রোজেন গ্যাসের বড় অংশ আয়নিত হয় এবং মহাজাগতিক অন্ধকার যুগের অবসান ঘটতে থাকে। নক্ষত্রগুলোর জীবন শেষে অনেক ক্ষেত্রে সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটে। এতে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে তৈরি ভারী মৌল মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী প্রজন্মের নক্ষত্র, গ্রহ এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান তৈরির পথ এভাবেই তৈরি হয়।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বাথের নেতৃত্বে পরিচালিত মেগাট্রন প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো এবং ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোফিজিকস অব প্যারিসের গবেষকেরাও কাজ করছেন। প্রকল্পটিতে মহাবিশ্বের প্রথম যুগে গ্যাস কীভাবে চলাচল করেছে, নক্ষত্রের আলো কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং নক্ষত্রের জন্ম ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ কীভাবে বদলেছে, তা একই মডেলে অনুসরণ করা হচ্ছে।
সিমুলেশনটি এমন একটি তরুণ ছায়াপথের বিবর্তন অনুসরণ করে, যা সময়ের সঙ্গে বর্তমান আকাশগঙ্গার কাছাকাছি ভরের একটি ছায়াপথে পরিণত হতে পারে। এর মাধ্যমে গবেষকেরা শুধু নক্ষত্রের জন্মই নয়, নক্ষত্রের বিকিরণ, গ্যাসের সঙ্গে তার মিথস্ক্রিয়া এবং সুপারনোভা বিস্ফোরণের পর নতুন মৌল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও বিশ্লেষণ করতে পারছেন।
গবেষকদের মতে, গ্যাস, নক্ষত্রের আলো ও রাসায়নিক উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক খুব জটিল। আগের তুলনামূলক সরল মডেলগুলোতে এসব প্রক্রিয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বাদ পড়ে যেতে পারে। মেগাট্রনের উচ্চ রেজল্যুশনের সিমুলেশনে গ্যাসের এমন কিছু সূক্ষ্ম কাঠামো দেখা যাচ্ছে, যা সরল মডেলে ধরা কঠিন।
মেগাট্রন প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য হলো মহাবিশ্বের অতীত সম্পর্কে দুটি ভিন্ন ধরনের তথ্যের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করা। প্রথমটি হলো জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা প্রাচীন ছায়াপথের আলো। দ্বিতীয়টি হলো আকাশগঙ্গার আশপাশে থাকা অতি পুরোনো নক্ষত্রের রাসায়নিক গঠন।
জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের শৈশবের ছায়াপথগুলোর আলো সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিয়েছে। অন্যদিকে, প্রাচীন নক্ষত্রের ভেতরে থাকা বিভিন্ন মৌলের অনুপাত বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অতীতের নক্ষত্রগুলোর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। এ ধরনের রাসায়নিক সংকেতকে অনেকটা মহাবিশ্বের অতীতের সংরক্ষিত রেকর্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মেগাট্রন সিমুলেশনের মাধ্যমে এই দুই ধরনের তথ্যের তুলনা করা সম্ভব হবে। কোনো প্রাচীন ছায়াপথে কী ধরনের নক্ষত্র তৈরি হয়েছিল, সেগুলো কী পরিমাণ আলো ও বিকিরণ ছড়িয়েছিল এবং মৃত্যুর পর কীভাবে আশপাশের গ্যাসে ভারী মৌল ছড়িয়ে দিয়েছিল, তা পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাবে। এতে প্রথম নক্ষত্রের প্রকৃতি সম্পর্কে প্রচলিত বিভিন্ন তত্ত্ব যাচাই করা সহজ হতে পারে।
এ ধরনের সিমুলেশন তৈরি করতে বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন। মেগাট্রন প্রকল্পের জন্য যুক্তরাজ্যের জাতীয় সুপারকম্পিউটারগুলোতে ৪ কোটি প্রসেসর-ঘণ্টা ব্যবহারের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এই পরিমাণ কম্পিউটিং সক্ষমতা একসঙ্গে ৫০ লাখ ল্যাপটপ এক বছর চালানোর সমতুল্য।
প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালে এবং ২০৩০ সাল পর্যন্ত চলার কথা রয়েছে। গবেষকেরা পরবর্তী পর্যায়ে আরও বেশি রেজল্যুশন ও উন্নত পদার্থবৈজ্ঞানিক মডেল ব্যবহার করে সিমুলেশন তৈরির পরিকল্পনা করছেন। এতে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের পর্যবেক্ষণ এবং প্রাচীন নক্ষত্রের রাসায়নিক তথ্যের সঙ্গে তুলনা আরও নিখুঁত হবে।
পৃথিবী, মানুষ ও জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন, অক্সিজেন, লোহাসহ অনেক ভারী মৌল নক্ষত্রের অভ্যন্তরে তৈরি হয়েছে। মহাবিশ্বের প্রথম নক্ষত্রগুলো এসব মৌল তৈরির প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। পরে নক্ষত্রের বিস্ফোরণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়ায় সেগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। সেই উপাদান থেকেই পরবর্তী প্রজন্মের নক্ষত্র ও গ্রহ গঠনের উপকরণ তৈরি হয়।
তবে মেগাট্রন গবেষণা থেকে এখনই প্রথম নক্ষত্রের সব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। এটি মূলত তাত্ত্বিক মডেল ও কম্পিউটার সিমুলেশন। এর ফলাফলকে বাস্তব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের নতুন তথ্য এবং আকাশগঙ্গার প্রাচীন নক্ষত্রগুলোর রাসায়নিক বিশ্লেষণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গবেষকদের আশা, মেগাট্রনের পরবর্তী সিমুলেশনগুলো মহাবিশ্বের প্রথম নক্ষত্রের জন্ম, ছায়াপথের বিবর্তন এবং প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলগুলোর উৎপত্তি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা দেবে। মহাবিশ্বের সূচনালগ্নের ইতিহাস বুঝতে এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: ইউনিভার্সিটি অব বাথ, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো, ScienceDaily, EurekAlert এবং The Open Journal of Astrophysics।