
সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণে সরকার বদ্ধপরিকর বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু।
বুধবার (২৯ জুলাই) বিশ্ব বাঘ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এবারের বিশ্ব বাঘ দিবসের প্রতিপাদ্য—‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’।
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় প্রাণী এবং সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পাহারাদার। একটি ‘কিস্টোন স্পিসিস’ হিসেবে বাঘ সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বাঘ সংরক্ষণ মানে শুধু একটি প্রাণীকে রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে সুন্দরবনের অন্যান্য বন্যপ্রাণী, বনজ সম্পদ, খাদ্য ও প্রজননক্ষেত্রসহ পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থার সুরক্ষা জড়িত।
তিনি বলেন, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা এবং মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত কমাতে সরকার সম্প্রতি ১০ সদস্যের একটি কমিশন গঠন করেছে। কমিশন সুন্দরবনে বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, অবৈধভাবে দখল করা বনভূমি পুনরুদ্ধার এবং বনসংলগ্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করবে।
৮ বছরে বেড়েছে ১৯ বাঘ
পরিবেশমন্ত্রী জানান, সরকারের আন্তরিকতা, বন বিভাগের নিরলস প্রচেষ্টা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহযোগিতায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপ অনুযায়ী, ২০১৫ সালে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪টিতে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জরিপে সুন্দরবনে ১২৫টি বাঘের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
বাঘ সংরক্ষণে ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম, কমিউনিটি প্যাট্রোলিং গ্রুপ এবং স্থানীয় বননির্ভর জনগোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলেও জানান তিনি।
বাঘ পাচারে ‘জিরো টলারেন্স’
বাঘ ও এর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কিংবা ট্রফি পাচারের বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে বলে জানান পরিবেশমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট এবং বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। বাঘ-সংক্রান্ত অপরাধের তথ্য প্রদানকারীদের জন্য ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক পুরস্কারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বাঘের জন্য ৮০ পুকুর, ২০ টিলা
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বাঘ বাংলাদেশের সাহসিকতা ও ঐতিহ্যের প্রতীক। সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় সংরক্ষিত এলাকার পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে।
বাঘের সুপেয় পানির সংকট মোকাবিলায় সুন্দরবনে ৮০টি পুকুর খনন এবং বিশ্রামের জন্য ২০টি টিলা তৈরি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। লোকালয় থেকে বনাঞ্চল আলাদা রাখতে নাইলনের নেট দিয়ে বেড়া দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বাঘের লোকালয়ে প্রবেশের ঘটনাও কমেছে।
নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে পর্যটকের সংখ্যা
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম বলেন, সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বাঘের গুরুত্ব অপরিসীম। বাঘের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে সুন্দরবনে টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
তিনি বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বাঘের আবাসস্থল সুরক্ষায় পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ এবং খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ।
আলোচনায় আরও অংশ নেন ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম এবং আইইউসিএন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ বিপাশা এস হোসেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয় ও বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ছাড়াও প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।