News update
  • শাহজালাল বিমানবন্দরের বলাকা লাউঞ্জে আগুন     |     
  • ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে যেসব এলাকায়     |     
  • ড্যাব এর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সমাবেশে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান     |     
  • জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে এনসিপির শীর্ষ নেতারা     |     
  • হরমুজ প্রণালী খুলতে ইরান-ওমান সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে     |     
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, বিশেষ সংবাদদাতা : সম্পাদকীয় 2026-08-08, 3:23pm

ক্ষমতা বদলেছে, রাষ্ট্র কি বদলেছে?


বাংলাদেশের রাজনীতিতে ৫ আগস্ট ২০২৪ নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক বাঁক। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উত্তেজনা, আন্দোলন, সংঘাত ও গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটেছে। এরপর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে গেছে। পুরোনো রাজনৈতিক সমীকরণ ভেঙেছে, নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।

কিন্তু দুই বছর পর দাঁড়িয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—ক্ষমতা বদলেছে, রাষ্ট্র কি বদলেছে?

প্রশ্নটি সহজ, কিন্তু উত্তরটি সহজ নয়।

কারণ সরকার পরিবর্তন আর রাষ্ট্র পরিবর্তন এক বিষয় নয়। একটি সরকার চলে যায়, আরেকটি সরকার আসে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আগের মতোই থাকে, প্রশাসনের রাজনৈতিক ব্যবহার যদি বন্ধ না হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি ক্ষমতাসীনদের প্রতি আনুগত্যকে পেশাদারিত্বের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়, বিচারব্যবস্থা যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হয়—তাহলে পরিবর্তনটি শেষ পর্যন্ত কতটা অর্থবহ?

ক্ষমতার পালাবদলই কি পরিবর্তন?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু প্রতিবারই একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—ক্ষমতায় গিয়ে নতুনরা কি পুরোনো ভুল থেকে শিক্ষা নেয়?

দুঃখজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় দুর্বলতা হলো, ক্ষমতার বাইরে থাকলে যে দল গণতন্ত্র, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের কথা বলে, ক্ষমতায় যাওয়ার পর অনেক সময় সেই একই দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে শুরু করে।

ফলে সমস্যাটা কোনো একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সমস্যাটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির।

যে রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক স্বার্থ এবং রাষ্ট্রের স্বার্থকে এক করে দেখা হয়, সেখানে সরকার বদলালেও সাধারণ মানুষের অবস্থান খুব বেশি বদলায় না।

আজ তাই আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাংলাদেশ কি এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করতে পারছে, যেখানে কোনো দল ক্ষমতায় গিয়ে রাষ্ট্রকে নিজের দলীয় সম্পত্তি মনে করতে পারবে না?

বিচার চাই, প্রতিশোধ নয়

অতীতের অন্যায় ও অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, হত্যা, নির্যাতন, দুর্নীতি কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত ও বিচারের আওতায় আসা উচিত।

কিন্তু বিচার এবং প্রতিশোধের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, আইনের ভিত্তিতে এবং আদালতের স্বাধীনতার ভিত্তিতে। রাজনৈতিক পরিচয় কারও অপরাধের প্রমাণ হতে পারে না। আবার রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ অপরাধের দায় থেকেও মুক্তি পেতে পারেন না।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—আমরা কি অতীতের অপরাধের বিচার করতে গিয়ে ভবিষ্যতের জন্য নতুন কোনো অন্যায়ের সংস্কৃতি তৈরি করব, নাকি এমন একটি বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করব যেখানে ক্ষমতাবান এবং সাধারণ নাগরিক একই আইনের অধীন থাকবে?

এই জায়গাতেই রাষ্ট্রের পরিপক্বতার পরীক্ষা।

গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়

গণতন্ত্রকে আমরা অনেক সময় শুধু নির্বাচন দিয়ে পরিমাপ করি। কিন্তু নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি অংশ মাত্র।

একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার।

একজন নাগরিক সরকারের সমালোচনা করলে তিনি রাষ্ট্রের শত্রু হয়ে যাবেন—এমন ধারণা গণতন্ত্রের সঙ্গে যায় না।

বরং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্র, যেখানে সরকারকে প্রশ্ন করা যায়, সমালোচনা করা যায় এবং ভুল হলে তার জবাবদিহি দাবি করা যায়।

কারণ সরকার রাষ্ট্র নয়। সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। আর রাষ্ট্রের মালিক জনগণ।

প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে পরিবর্তন টেকসই হবে না

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম মূল কারণ দুর্বল প্রতিষ্ঠান।

নির্বাচন কমিশন যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে, বিচার বিভাগ যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না হয়, প্রশাসন যদি ক্ষমতাসীন দলের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি রাজনৈতিক নির্দেশনার বাইরে পেশাদারভাবে কাজ করতে না পারে—তাহলে কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারবে না।

ব্যক্তি পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করা যায় না।

আজ একজন ক্ষমতায় আছেন, কাল অন্যজন আসবেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠান যদি একই থাকে, তাহলে ক্ষমতার চরিত্রও শেষ পর্যন্ত একই রকম হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক সংস্কার হওয়া উচিত—ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থায় যাওয়া।

অর্থনীতির প্রশ্নটিও ভুলে গেলে চলবে না

রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ রাজনৈতিক বক্তৃতা নয়; তার নিজের জীবন।

বাজারে নিত্যপণ্যের দাম কত? চাকরির সুযোগ কেমন? তরুণদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ? ব্যবসা-বিনিয়োগের পরিবেশ কেমন? ব্যাংকিং খাত কতটা স্থিতিশীল? মধ্যবিত্ত পরিবার তার আয় দিয়ে মাসের খরচ চালাতে পারছে কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে রাষ্ট্রের সফলতা-ব্যর্থতার মাপকাঠি।

রাজনৈতিক পরিবর্তন যদি মানুষের জীবনযাত্রায় নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে না পারে, তাহলে সেই পরিবর্তনের সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

বিভাজনের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে

বাংলাদেশের আরেকটি বড় সংকট রাজনৈতিক বিভাজন।

আমরা মানুষকে খুব সহজেই ‘আমাদের লোক’ এবং ‘ওদের লোক’ হিসেবে ভাগ করে ফেলি। রাজনৈতিক পরিচয় যেন নাগরিক পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।

এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

একজন আওয়ামী লীগ সমর্থক মানেই খারাপ মানুষ নন। একজন বিএনপি সমর্থক মানেই রাষ্ট্রবিরোধী নন। আবার কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হওয়া কাউকে আইনের ঊর্ধ্বেও তুলে দেয় না।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো—আমরা ভিন্নমত পোষণ করব, তর্ক করব, নির্বাচন করব, পরাজিত হব, আবার লড়াই করব; কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অস্তিত্বহীন করে দেওয়ার চেষ্টা করব না।

রাজনীতি হবে প্রতিযোগিতার, শত্রুতার নয়।

নতুন বাংলাদেশ কেমন হবে?

‘নতুন বাংলাদেশ’ কথাটি এখন অনেক বেশি উচ্চারিত হয়। কিন্তু নতুন বাংলাদেশ বলতে আমরা কী বুঝি?

শুধু নতুন সরকার?

শুধু নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব?

নাকি এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতাসীনদের অন্যায়কে প্রশ্ন করা যাবে, বিরোধীদের অধিকার থাকবে, সাংবাদিক স্বাধীনভাবে লিখতে পারবেন, বিচারক স্বাধীনভাবে বিচার করতে পারবেন এবং একজন সাধারণ নাগরিক তার রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে রাষ্ট্রের সমান সেবা পাবেন?

যদি দ্বিতীয় অর্থটি সত্য হয়, তাহলে আমাদের কাজ এখনো অনেক বাকি।

কারণ রাষ্ট্র সংস্কার কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া।

ইতিহাসের শিক্ষা

বাংলাদেশের মানুষ বারবার পরিবর্তনের জন্য রাস্তায় নেমেছে। বারবার তারা আশা করেছে—এবার হয়তো রাষ্ট্রটি সত্যিই বদলাবে।

কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন স্থায়ী পরিবর্তন নিশ্চিত করে না।

স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা।

অতীতের ভুলের বিচার করতে হবে, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য নতুন ভুলের ভিত্তি তৈরি করা যাবে না।

প্রতিপক্ষকে দমন করে সাময়িক বিজয় অর্জন করা যায়; কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণ করা যায় না।

আজ বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কে ক্ষমতায় থাকবে—তা নয়।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—যে-ই ক্ষমতায় থাকুক, রাষ্ট্র কি জনগণের থাকবে?

৫ আগস্টের পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই হবে, যখন বাংলাদেশের কোনো নাগরিককে আর রাষ্ট্রের কাছে নিজের অধিকার পাওয়ার জন্য রাজনৈতিক পরিচয়ের আশ্রয় নিতে হবে না।

যেদিন সরকার বদলালেও নাগরিকের অধিকার বদলাবে না, যেদিন ক্ষমতাসীন দল আর রাষ্ট্রকে এক করে দেখা হবে না, যেদিন বিরোধী মতকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে না—সেদিনই বলা যাবে, শুধু ক্ষমতা নয়, সত্যিই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলেছে।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তাই আরেকটি ক্ষমতার পালাবদলে নয়; ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কেমন রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চাই, তার ওপর।