News update
  • বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টায় বন্ধ শপিংমল-মার্কেট, ৭টায় বিলবোর্ড     |     
  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সভ্যতার অগ্রগতিতে তরুণরাই মূল চালিকাশক্তি: স্বপন     |     
  • সিলেটে স্বামী-স্ত্রীসহ তিনজনকে গলা কেটে হত্যা     |     
  • একাদশে ভর্তিতে এবারও পরীক্ষা নেই, ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে আবেদন      |     
  • সামুদ্রিক বন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত     |     
মোহাম্মদ মামুন কবীর ধর্ম ও জীবন 2026-08-12, 7:33am

আল্লাহর স্মরণে অন্তরের প্রশান্তি

কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা

jikir-28b91ff89eaa520e65ca1269cf00d1501786498415.jpg

ছবি: সংগৃহীত


মানুষের জীবনে দুশ্চিন্তা, হতাশা, ভয়, অস্থিরতা ও নানা সংকট আসতেই থাকে। অর্থ-সম্পদ, সম্মান, পরিবার কিংবা পার্থিব সাফল্য অনেক কিছু অর্জন করেও মানুষ অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি খুঁজে পায় না। ইসলাম আমাদের শেখায়—অন্তরের প্রকৃত শান্তি ও প্রশান্তির সবচেয়ে বড় উৎস হলো আল্লাহর স্মরণ, জিকির ও তাঁর কাছে দোয়া করা।


আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন—


‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’

—সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮


এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষের হৃদয়ের প্রকৃত প্রশান্তি কেবল দুনিয়াবি উপকরণের মাধ্যমে আসে না; বরং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার মধ্যেই রয়েছে অন্তরের স্থায়ী শান্তি।


জিকির কী?


‘জিকির’ অর্থ স্মরণ করা। ইসলামের পরিভাষায় আল্লাহকে স্মরণ করা, তাঁর প্রশংসা করা, তাসবিহ পাঠ করা, তাহলিল, তাকবির, তাহমিদ, ইস্তিগফারসহ বিভিন্ন দোয়া ও আমলের মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করাকে জিকির বলা হয়।


আল্লাহ তাআলা বলেন—


‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করো।’

—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৪১-৪২


অর্থাৎ একজন মুমিনের জীবন যেন আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। শুধু মসজিদে বা নামাজের সময় নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণ করা উচিত।


জিকিরে অন্তরের প্রশান্তি


মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন দুনিয়ার ভয়, দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তা তাকে সহজেই গ্রাস করে। কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাঁর স্মরণে নিজেকে ব্যস্ত রাখলে অন্তরে এক ধরনের আস্থা তৈরি হয়।


আল্লাহ বলেন—


‘যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, নিশ্চয়ই তার জীবন হবে সংকীর্ণ।’

—সূরা ত্বহা, ২০:১২৪


অন্যদিকে আল্লাহর স্মরণ মানুষকে তাঁর ওপর নির্ভর করতে শেখায়। ফলে বিপদ-আপদ এলেও মুমিন জানে—আল্লাহ সবকিছু দেখছেন এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে।


দোয়া কেন গুরুত্বপূর্ণ?


দোয়া হলো বান্দার সঙ্গে আল্লাহর সরাসরি সম্পর্কের অন্যতম মাধ্যম। মানুষ যখন নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে আল্লাহর কাছে সাহায্য চায়, তখন সে মূলত স্বীকার করে যে প্রকৃত ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে।


আল্লাহ তাআলা বলেন—


‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’

—সূরা গাফির, ৪০:৬০


আরও বলেন—


‘আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, তখন বলে দাও—আমি তো নিকটেই আছি। কোনো আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।’

—সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৬


এই আয়াতগুলো আমাদের শেখায়, আল্লাহর কাছে দোয়া করার জন্য কোনো দূরত্ব নেই। বান্দা আন্তরিকভাবে তাঁকে ডাকলে আল্লাহ তার কথা শোনেন।


বিপদের সময় দোয়া ও জিকির


রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও বিভিন্ন দুশ্চিন্তা ও বিপদের সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। তিনি শিখিয়েছেন, বিপদের সময় বান্দার উচিত আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া।


হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিপদের সময় বলতেন—


‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আজিমুল হালিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রব্বুল আরশিল আজিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রব্বুস সামাওয়াতি ওয়া রব্বুল আরদ, ওয়া রব্বুল আরশিল কারিম।’


অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তিনি মহান ও সহনশীল। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তিনি মহান আরশের রব। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তিনি আসমানসমূহের রব, জমিনের রব এবং সম্মানিত আরশের রব।

—সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম


এ হাদিস আমাদের শেখায়, বিপদের মুহূর্তে আতঙ্কিত না হয়ে আল্লাহর মহত্ত্ব স্মরণ করা এবং তাঁর ওপর ভরসা করা উচিত।


ইস্তিগফারের গুরুত্ব


জিকিরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।


আল্লাহ তাআলা বলেন—


‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল।’

—সূরা নূহ, ৭১:১০


রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও প্রতিদিন বহুবার ইস্তিগফার করতেন। সহিহ হাদিসে এসেছে, তিনি দিনে একশবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন।

—সহিহ মুসলিম


তাই নিয়মিত ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল।


ছোট ছোট জিকিরের বড় ফজিলত


রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—


‘দুটি বাক্য জিহ্বায় হালকা, পাল্লায় ভারী এবং রহমানের কাছে প্রিয়: সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম।’

—সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম


আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—


‘যে ব্যক্তি দিনে একশবার বলে, “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি”, তার গুনাহসমূহ সমুদ্রের ফেনার মতো হলেও ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’

—সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম


তাই জিকিরের জন্য সবসময় দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন নেই। কাজের ফাঁকে, হাঁটতে হাঁটতে কিংবা অবসর সময়ে সহজ কিছু জিকির করা যায়।


সকাল-সন্ধ্যার জিকির


মুমিনের দৈনন্দিন জীবনে সকাল-সন্ধ্যার জিকিরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আল্লাহ বলেন—


‘আর তোমার রবকে নিজের অন্তরে বিনয়ের সঙ্গে, ভয় ও আশা নিয়ে এবং অনুচ্চস্বরে সকাল-সন্ধ্যায় স্মরণ করো।’

—সূরা আল-আরাফ, ৭:২০৫


সকাল ও সন্ধ্যায় নিয়মিত আয়াতুল কুরসি, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাসসহ সহিহ হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন জিকির ও দোয়া পাঠ করা সুন্নাহ।


জিকির শুধু মুখের আমল নয়


জিকিরের প্রকৃত অর্থ শুধু মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণ করা নয়। একজন মানুষ মুখে আল্লাহর নাম নেবে, অন্তরে তাঁর প্রতি বিশ্বাস রাখবে এবং জীবনে তাঁর নির্দেশ মেনে চলবে—এটাই জিকিরের পূর্ণতা।


আল্লাহর স্মরণ মানুষকে অন্যায়, অহংকার, মিথ্যা, গিবত ও পাপ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। কারণ যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে স্মরণ করে, সে জানে—আল্লাহ তার প্রতিটি কাজ সম্পর্কে অবগত।


দোয়া কবুল না হলে হতাশ হওয়া যাবে না


অনেক সময় মানুষ দোয়া করার পর দ্রুত ফল না পেলে হতাশ হয়ে যায়। কিন্তু মুমিনের উচিত আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে আশাবাদী থাকা।


রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে দোয়া করলে—যদি সে কোনো গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া না করে—তাহলে আল্লাহ তাকে তার দোয়ার কোনো না কোনো প্রতিদান দেন: হয় দুনিয়াতেই তা প্রদান করেন, অথবা আখিরাতের জন্য রেখে দেন, অথবা তার অনুরূপ কোনো অকল্যাণ দূরে সরিয়ে দেন।

—মুসনাদ আহমাদ


তাই দোয়ার ফল দেরি হলেও বান্দার উচিত দোয়া ছেড়ে না দেওয়া।


আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল


জিকির ও দোয়া মানুষকে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখায়। আল্লাহ বলেন—


‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’

—সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩


অর্থাৎ দোয়া করার পাশাপাশি নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করতে হবে এবং ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিতে হবে। এই বিশ্বাস মানুষের অন্তরে গভীর প্রশান্তি সৃষ্টি করে।


কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে জিকির ও দোয়া করা যায়?


প্রতিদিনের জীবনে সহজভাবে কিছু আমল করা যেতে পারে—


সুবহানাল্লাহ — আল্লাহ পবিত্র।

আলহামদুলিল্লাহ — সব প্রশংসা আল্লাহর।

আল্লাহু আকবার — আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ — আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।

আস্তাগফিরুল্লাহ — আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই।

সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি — আল্লাহ পবিত্র এবং তাঁরই প্রশংসা।

সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন জিকির ও দোয়া পড়া।

বিপদে ও দুশ্চিন্তায় আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা।

নামাজের পর এবং সিজদায় আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজন তুলে ধরা।

উপসংহার


দুনিয়ার সম্পদ মানুষের বাহ্যিক জীবনকে স্বচ্ছল করতে পারে, কিন্তু অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি দিতে পারে না। কোরআন আমাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—আল্লাহর স্মরণেই অন্তরের প্রশান্তি।


তাই জীবনে যত দুশ্চিন্তা, কষ্ট, ভয় বা অনিশ্চয়তাই আসুক, একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া। নিয়মিত নামাজ, জিকির, ইস্তিগফার, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করা।


আল্লাহ আমাদের সবাইকে বেশি বেশি জিকির, দোয়া ও ইবাদত করার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের অন্তরকে তাঁর স্মরণে প্রশান্ত রাখুন। আমিন।