
কেউ গিয়েছিলেন ঋণ শোধ করতে। কেউ স্বপ্ন দেখেছিলেন দেশে ফিরে নতুন ঘর বানাবেন। কারও ইচ্ছা ছিল বিয়ে করে সংসার পাতার। আবার কেউ চেয়েছিলেন পরিবারের অভাব ঘুচিয়ে সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে।
সব স্বপ্নই ছিল আপনজনকে ঘিরে। কিন্তু সেই স্বপ্নের দেশে আর ফেরা হলো না।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ বাংলাদেশি। গত রোববারের এই ঘটনায় নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যাঁরা স্বজনদের জন্য জীবন গড়তে বিদেশে গিয়েছিলেন, তাঁদেরই এখন ফিরতে হচ্ছে কফিনবন্দি হয়ে।
নিহতদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁয়। তাঁদের ১২ জন আত্রাই উপজেলার এবং একজন নওগাঁ সদর উপজেলার বাসিন্দা। দুজনের বাড়ি নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায়। আর একজন রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাসিন্দা।
‘বাড়ি এসে বিয়া করমু মা’
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালি গ্রামের মোহন প্রামাণিক (২২) ও তাঁর ছোট ভাই সুমন প্রামাণিক (১৬) নিহত হয়েছেন অগ্নিকাণ্ডে। দুই সন্তানকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তাঁদের মা ময়না খাতুন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘বড় ছাওয়াল গেছে সাত বছর হচ্ছে, আর মেজো ছাওয়াল গেছে দুই বছর। কোনোদিনও ছুটিতে আসেনি। ছাওয়ালটা বলছিল, মা, কষ্ট করে খেয়ে দেনা শোধ করছি কেবল। বাড়ির কাজটা শুরু করছি, বাড়ি এসে বিল্ডিংয়ের কাজটা শেষ করে বিয়া করমু মা।’
ছেলের বিয়ের জন্য পাত্রী দেখার স্বপ্ন দেখেছিলেন মা। এখন সেই ছেলের শেষ মুখ দেখার অপেক্ষায় তিনি।
১৪ দিনের সন্তান, বাবার অপেক্ষায়
নিহত রুবেল প্রামাণিকের বাড়ির শোক আরও গভীর। নয় বছর আগে সৌদি আরব গিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন পর ছুটিতে বাড়ি এসে বিয়ে করেন। পরে আবার ফিরে যান সৌদি আরবে।
রুবেলের ঘর আলো করে জন্ম নেয় সন্তান। সেই নবজাতকের বয়স এখন মাত্র ১৪ দিন। সন্তানকে রেখে কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার মাত্র তিন মাসের মাথায় প্রাণ হারালেন তিনি।
রুবেলের বাবা মোহাম্মদ সাইদুর বলেন, ‘আমার নাতনি হছে, কেবল ১৪ দিন হচ্ছে। ১৪ দিনের ছাওয়াল থুয়ে চলে গেল।’
১৪ দিনের শিশুটি জানবে না, যার ফেরার অপেক্ষায় থাকার কথা, সেই বাবা আর কখনো ফিরবেন না।
বিদেশে গিয়েছিলেন ঋণ শোধ করতে
উজানপৈ গ্রামের ফরিদ শেখ দেড় বছর আগে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। বিদেশ যাওয়ার জন্য পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছিল। তাঁর পাঠানো টাকায় সংসার চলত। সেই টাকা দিয়েই ঋণ শোধের চেষ্টা করছিল পরিবার।
এখন স্ত্রী ও দুই বছরের মেয়েকে রেখে ফরিদ ফিরবেন লাশ হয়ে।
ফরিদের বাবা ময়েন শেখ বলেন, ‘ছেলেটাক বিদেশ পাঠাতে হামি অনেক ঋণের মধ্যে পড়ে আছি। ফরিদের পাঠানো টাকা দিয়েই সংসার চলছিল। এখন ঋণ শোধ করমু ক্যামন করে আর সংসার চালামু ক্যামনে?’
ঘুমের মধ্যেই নিভে গেল জীবন
ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভও ছিলেন পরিবারের স্বপ্নের ভরসা। বিএ পাস করার পর স্থানীয় একটি এনজিওতে চাকরি করতেন তিনি। চাকরি চলে যাওয়ার পর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার আশায় তিন বছর আগে সৌদি আরব যান।
স্বজনদের ভাষ্য, অগ্নিকাণ্ডের সময় শ্রমিকেরা ঘুমিয়ে ছিলেন। কারখানার মূল ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল বলেও তাঁরা জানতে পেরেছেন। ঘুমের মধ্যেই আগুনে পুড়ে মৃত্যু হয় হাসিবুলসহ সেখানে থাকা শ্রমিকদের।
৪০ দিনের সন্তান নিয়ে স্ত্রীর আহাজারি
নাটোরের নলডাঙ্গার শামীম হোসেন (৩০) সাত মাস আগে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। তাঁর ৪০ দিনের একটি সন্তান রয়েছে।
স্বামীকে হারিয়ে শিশুটিকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী মিতু বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটা বাবার মুখ চিনে উঠতে পারল না। সংসারের সুখের জন্য বিদেশে গিয়েছিল, এখন শুধু তাঁর লাশটাই দেশে ফিরবে। আমার সন্তানকে নিয়ে আমি এখন কীভাবে বাঁচব?’
শামীমের মতো নিহত রবিউল আওয়াল হৃদয় ও সাব্বির হোসেন শুভও কৃষক পরিবারের সন্তান। ধারদেনা করে তাঁরা বিদেশে গিয়েছিলেন। তাঁদের অনেকেরই এখনো ঋণ পরিশোধ হয়নি।
টিকিট কেটেও দেশে ফেরা হলো না শ্যামলের
রাজশাহীর বাগমারার শ্যামল উদ্দিন মাঝি আট বছর আগে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। তিন মেয়ের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি পরিবারের অনুরোধে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নেন। আগামী শুক্রবার দেশে ফেরার জন্য বিমানের টিকিটও কেটেছিলেন।
কিন্তু জীবিত আর ফেরা হলো না তাঁর।
শ্যামলের স্ত্রী রশিদা খাতুন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘তুমার সঙ্গে হামার কালকেই কথা হলো। তুমি বাড়িত আসবে বললে, আর রাতে তুমার মরার খবর পানু।’
এখন শুধু শেষ দেখার অপেক্ষা
নিহতদের গ্রামগুলোতে এখন একই দৃশ্য। স্বজনদের চোখে পানি। বাড়িতে বাড়িতে আহাজারি। কেউ প্রিয়জনের ছবি বুকে জড়িয়ে আছেন। কেউ নির্বাক হয়ে বসে আছেন।
কেউ অপেক্ষা করছেন শেষবার ছেলের মুখ দেখবেন বলে। কেউ অপেক্ষা করছেন স্বামীর নিথর দেহের পাশে বসবেন বলে। কোনো বাবা অপেক্ষা করছেন সন্তানের লাশ কাঁধে নেওয়ার জন্য।
আর কোথাও ১৪ দিনের শিশু কিংবা ৪০ দিনের সন্তান হয়তো বড় হয়ে একদিন জানতে চাইবে—বাবা কোথায়?
স্বজনদের এখন আর কোনো চাওয়া নেই। নেই স্বপ্ন পূরণের হিসাবও। তাঁদের একটাই অপেক্ষা—কবে দেশে ফিরবে প্রিয় মানুষগুলোর মরদেহ।
নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত এবং মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং কাজ করছে। যথাযথ প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দ্রুত দেশে আনার কার্যক্রম চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর শোক
রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে ১৬ বাংলাদেশির মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শোকবার্তায় তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে বাংলাদেশ মিশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীও শোক প্রকাশ করেছে।