News update
  • ডিজিটাল ব্যাংক চালুর সম্মতি পেল বিকাশ, রবি ও বাংলালিংকসহ ৪ প্রতিষ্ঠান     |     
  • এবার একদিনে ৮ জনের প্রাণ কেড়ে নিলো ডেঙ্গু     |     
  • গুলশানে গাড়ি চাপায় পথচারীর মৃত্যু, ৯ লাখ টাকায় আসামিদের সঙ্গে আপোস     |     
  • টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর নেতৃত্ব নি‌শ্চি‌তে জোর বাংলা‌দে‌শের     |     
  • জাতিসংঘে আজ প্রথমবার ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান     |     
মোহাম্মদ মামুন কবীর ধর্ম ও জীবন 2026-09-03, 6:48am

কোরআনের সুমধুর তেলাওয়াতে থেমে যায় ব্যস্ততা, প্রশান্ত হয় হৃদয়

al-quran-c9b995999743442693c7dd1967755e9f1788396509.png

গ্রাফিক্স। এ আই দিয়ে তৈরি।


চারপাশে তখনও ভোরের নরম আলো। পৃথিবী ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। পাখির কণ্ঠে ভেসে আসছে নতুন দিনের ডাক। কোথাও মসজিদের মিনার থেকে ফজরের আজান শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। ব্যস্ত নগরী তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। এমন এক প্রশান্ত সময়ে যখন কোনো ঘর থেকে ভেসে আসে পবিত্র কোরআনের সুমধুর তেলাওয়াত, তখন যেন মুহূর্তের জন্য থেমে যায় চারপাশের কোলাহল। শব্দগুলো শুধু কানে পৌঁছায় না—নীরবে ছুঁয়ে যায় হৃদয়।


পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহর বাণী। একজন মুমিনের কাছে কোরআন শুধু একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়; এটি জীবনের পথনির্দেশ, অন্ধকারে আলো, দুঃসময়ে আশ্রয় এবং বিপন্ন হৃদয়ের জন্য প্রশান্তির বার্তা। কোরআনের প্রতিটি আয়াত মানুষের অন্তরে নতুন করে ঈমান জাগিয়ে তোলে। কখনো চোখে পানি এনে দেয়, কখনো ভুলের জন্য অনুতপ্ত করে, আবার কখনো কঠিন সময়ে বুকের ভেতর সাহস জাগায়।


মানুষের জীবন সব সময় একরকম থাকে না। কখনো আনন্দ, কখনো দুঃখ; কখনো সাফল্য, কখনো ব্যর্থতা। কখনো প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা, কখনো জীবিকার অনিশ্চয়তা, কখনো ভবিষ্যৎ নিয়ে অজানা ভয়। এসবের ভিড়ে মানুষ যখন নিজেকে একা মনে করে, তখন কোরআনের বাণী তাকে মনে করিয়ে দেয়—সে একা নয়; মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার সঙ্গে আছেন।


পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত ২৮)। এই আয়াত যেন অস্থির মানুষের জন্য এক গভীর সান্ত্বনা। জীবনের সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না, কিন্তু আল্লাহর বাণী মানুষকে ধৈর্য ধরতে শেখায়, আশা হারাতে নিষেধ করে এবং তাঁর ওপর ভরসা রাখতে উৎসাহিত করে।


কোরআন তেলাওয়াতের সৌন্দর্য শুধু এর শব্দের মাধুর্যে নয়। একজন কারির কণ্ঠে যখন আয়াতগুলো উচ্চারিত হয়, তখন শব্দের সঙ্গে মিশে থাকে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, ভয়, আশা ও আত্মসমর্পণের অনুভূতি। শ্রোতা যদি মনোযোগ দিয়ে শোনেন, অনেক সময় একটি আয়াতই তাঁর মনের গভীরে এমনভাবে স্পর্শ করে, যা দীর্ঘ কথাতেও সম্ভব হয় না।


বিশেষ করে রাতের নীরবতা কিংবা ভোরের শান্ত পরিবেশে কোরআন তেলাওয়াতের অনুভূতি আরও গভীর হতে পারে। দিনের ব্যস্ততা শুরু হওয়ার আগে কয়েক মিনিট কোরআনের সঙ্গে কাটানো একজন মানুষের পুরো দিনের মানসিক অবস্থাকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। মোবাইল ফোনের পর্দা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যস্ততা কিংবা নানা দুশ্চিন্তার পরিবর্তে দিনের শুরুটা যদি আল্লাহর বাণী দিয়ে হয়, তাহলে হৃদয়ে তৈরি হতে পারে এক ভিন্ন ধরনের প্রশান্তি।


আজকের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানুষের হাতে সময় যেন ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকের প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল ফোন দেখা। একের পর এক সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ভিডিও ও নানা তথ্য মানুষের মনকে ব্যস্ত করে রাখে। অথচ সেই একই সময়ের সামান্য কিছু অংশ যদি কোরআন তেলাওয়াত ও অর্থ বোঝার পেছনে ব্যয় করা যায়, তাহলে আত্মিক জীবনে তৈরি হতে পারে এক সুন্দর পরিবর্তন।


কোরআন তেলাওয়াত মানুষের হৃদয়কে নরম করে। অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখায়। অহংকার থেকে দূরে রাখে। অন্যায় ও পাপের পরিণতি স্মরণ করিয়ে দেয়। একই সঙ্গে মহান আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার কথা বলে মানুষকে নতুন করে ফিরে আসার সাহস দেয়।


অনেক মানুষ আছেন, যারা জীবনের কঠিন কোনো সময়ে কোরআনের একটি আয়াত শুনে কিংবা পড়ে নতুনভাবে আশাবাদী হয়েছেন। কেউ দুঃখের সময় সান্ত্বনা পেয়েছেন, কেউ ভুল পথ থেকে ফিরে এসেছেন, আবার কেউ জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। এ কারণেই কোরআনের তেলাওয়াতকে শুধু একটি ইবাদত হিসেবে দেখলে এর গভীর প্রভাবের পুরোটা উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না।


তবে কোরআন তেলাওয়াতের সঙ্গে এর অর্থ ও শিক্ষা বোঝার চেষ্টাও জরুরি। কোরআনের আয়াত শুধু সুন্দর কণ্ঠে পড়ার জন্য নয়; বরং জীবনে ধারণ করার জন্য। সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা, বাবা-মায়ের সঙ্গে সদাচরণ, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যের অধিকার নষ্ট না করা এবং অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখা—কোরআনের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন।


শুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত শেখাও গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চারণের ভুল এড়াতে অভিজ্ঞ কারির কাছ থেকে তাজবিদ শেখা যেতে পারে। যারা আরবি পড়তে পারেন না, তারা ধীরে ধীরে শেখার চেষ্টা করতে পারেন। কারণ কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। একজন মানুষ জীবনের যে পর্যায়েই থাকুন না কেন, আল্লাহর বাণীর দিকে ফিরে আসার দরজা সব সময় খোলা।


একটি ছোট্ট ঘর, একটি কোরআন এবং কয়েক মিনিটের নীরবতা—কখনো কখনো একজন মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রশান্তির আর কিছু প্রয়োজন হয় না। পৃথিবীর নানা ব্যস্ততা, প্রতিযোগিতা ও অস্থিরতার বাইরে কোরআনের কয়েকটি আয়াত মানুষকে নিজের ভেতরে ফিরে তাকানোর সুযোগ করে দেয়।


সকালের আলো যেমন অন্ধকার দূর করে, তেমনি কোরআনের আলোও মানুষের অন্তরের অন্ধকার দূর করতে পারে। তাই প্রতিদিনের জীবনে কিছুটা সময় কোরআন তেলাওয়াতের জন্য রাখা হোক। শুধু তেলাওয়াত নয়, আয়াতের অর্থ বোঝা এবং সেই শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হোক।


হয়তো জীবনের সব সমস্যা একদিনে দূর হবে না। হয়তো সব প্রশ্নের উত্তরও সঙ্গে সঙ্গে মিলবে না। কিন্তু কোরআনের সান্নিধ্যে হৃদয় শিখবে ধৈর্য, শিখবে কৃতজ্ঞতা, শিখবে ক্ষমা করতে এবং সবচেয়ে বড় কথা—শিখবে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করতে।


কোরআনের সুমধুর তেলাওয়াত তাই শুধু একটি শব্দধ্বনি নয়; এটি অস্থির হৃদয়ের জন্য প্রশান্তির বার্তা, হতাশ মানুষের জন্য আশার আলো এবং পথহারা মানুষের জন্য হেদায়াতের দিশা।


আসুন, দিনের শুরু হোক আল্লাহর বাণী দিয়ে। হৃদয় জুড়ে থাকুক কোরআনের আলো। আমাদের ঘর, পরিবার ও সমাজ ভরে উঠুক কোরআনের শিক্ষা, শান্তি ও বরকতে।