
কারখানার উৎপাদন লাইন, হাসপাতালের সেবা, গুদামে পণ্য সাজানো কিংবা অফিসের জটিল কাজ, সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে রোবটের ব্যবহার। একসময় রোবট বলতে মানুষের নির্দেশে নির্দিষ্ট কাজ করা যন্ত্রকেই বোঝানো হতো। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেন্সর ও উন্নত সফটওয়্যারের সমন্বয়ে রোবট মানুষের আশপাশের পরিবেশ বুঝতে, পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে এবং কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে পারছে। ফলে কর্মক্ষেত্রে মানুষের জায়গা পুরোপুরি দখল করার বদলে মানুষের সহযোগী হিসেবে রোবটকে যুক্ত করার ধারণা গুরুত্ব পাচ্ছে।
প্রযুক্তিবিশ্বে এ ধরনের রোবট পরিচিত ‘কোলাবোরেটিভ রোবট’ বা ‘কোবট’ নামে। পাশাপাশি মানুষের মতো গঠন ও চলাফেরার ক্ষমতাসম্পন্ন হিউম্যানয়েড রোবটও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণাগারে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আগামী দিনে এসব প্রযুক্তি উৎপাদনব্যবস্থা, কর্মপরিবেশ ও মানুষের কাজের ধরনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সহকর্মী হিসেবে রোবটের উত্থান
শিল্পকারখানায় দীর্ঘদিন ধরে রোবট ব্যবহৃত হলেও অধিকাংশ প্রচলিত শিল্প রোবট নির্দিষ্ট জায়গায় স্থাপন করা থাকে। নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী তারা একই ধরনের কাজ বারবার করতে পারে। গাড়ি তৈরির কারখানায় ওয়েল্ডিং, রং করা, ভারী যন্ত্রাংশ স্থানান্তর এবং পণ্য সংযোজনের মতো কাজে এসব রোবটের ব্যবহার রয়েছে।
তবে নতুন প্রজন্মের সহযোগী রোবটের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। এগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়, যাতে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একই কর্মক্ষেত্রে মানুষের পাশে কাজ করতে পারে। কোনো কর্মী যন্ত্রাংশ প্রস্তুত করলে রোবট সেটি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিতে পারে। কর্মী পণ্য পরীক্ষা করলে রোবট প্যাকেট সাজানো কিংবা প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করতে পারে।
এ ধরনের প্রযুক্তির লক্ষ্য মানুষের দক্ষতা ও রোবটের গতি, নির্ভুলতা এবং পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ করার ক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগানো। এতে কর্মীদের শারীরিক পরিশ্রম কমানো এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হয়।
হিউম্যানয়েড রোবটের ক্ষেত্রেও একই সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। মানুষের মতো হাত-পা ও দেহের কাঠামো থাকায় এসব রোবট এমন কিছু পরিবেশে কাজ করার জন্য তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে সিঁড়ি, দরজা, তাক, যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে সাজানো। ফলে সবকিছু নতুনভাবে তৈরি না করেও নির্দিষ্ট কাজে রোবট যুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আরও দক্ষ হচ্ছে রোবট
রোবটের সক্ষমতা বাড়ানোর পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। আগে কোনো রোবটকে নতুন কাজ শেখাতে হলে নির্দিষ্ট নির্দেশনা ও প্রোগ্রাম তৈরি করতে হতো। এখন উন্নত ক্যামেরা, সেন্সর, মেশিন লার্নিং এবং এআই প্রযুক্তির সাহায্যে কিছু রোবট পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে বস্তু শনাক্ত করতে এবং কাজের ধরন অনুযায়ী নিজেদের কার্যক্রম সামঞ্জস্য করতে পারে।
আন্তর্জাতিক রোবোটিকস ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে স্থাপিত শিল্প রোবটের ১০ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল সহযোগী রোবট। একই সংস্থার ২০২৬ সালের পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে কারখানায় ব্যবহৃত শিল্প রোবটের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫০ লাখে পৌঁছেছে। এসব তথ্য উৎপাদনব্যবস্থায় রোবটের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরে।
চীনের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোও ভার্চুয়াল পরিবেশে রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এতে বাস্তব কারখানায় বারবার পরীক্ষা না করেও বিভিন্ন পরিস্থিতিতে রোবটের কাজ শেখানো সম্ভব হতে পারে। তবে ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণে শেখা দক্ষতা বাস্তব পরিবেশে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রয়োগ করা এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।
কারখানা থেকে হাসপাতাল, সর্বত্র সম্ভাবনা
রোবটের ব্যবহার এখন আর উৎপাদনশিল্পে সীমাবদ্ধ নেই। হাসপাতালের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী পরিবহন, গুদামে পণ্য স্থানান্তর, হোটেলে খাবার পৌঁছে দেওয়া এবং বিপজ্জনক স্থানে পরিদর্শনের মতো কাজেও বিভিন্ন ধরনের রোবট ব্যবহৃত হচ্ছে।
হাসপাতালে রোবট নিয়মিত সরবরাহের কাজ করলে স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীর পরিচর্যা ও চিকিৎসাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেশি সময় দিতে পারেন। গুদামে স্বয়ংক্রিয় রোবট পণ্য বহন করলে কর্মীদের ভারী মালামাল টানার প্রয়োজন কমে। একইভাবে রাসায়নিক পদার্থ, অতিরিক্ত তাপ কিংবা মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে রোবট ব্যবহার করলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তবে রোবটের উপস্থিতি মানেই সব কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়া নয়। রোগীর অনুভূতি বোঝা, জটিল পরিস্থিতিতে মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা অনিশ্চিত পরিবেশে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে মানুষের দক্ষতা এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের চাকরি কি কমে যাবে?
কর্মক্ষেত্রে রোবটের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে মানুষের কর্মসংস্থান নিয়ে। যেসব কাজ একইভাবে বারবার করতে হয়, সেগুলো স্বয়ংক্রিয় হয়ে গেলে কিছু পেশায় কর্মীর চাহিদা কমতে পারে। বিশেষ করে পণ্য বাছাই, সাধারণ সংযোজন, পরিবহন এবং নির্দিষ্ট ধরনের উৎপাদনকাজে পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, রোবট পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার উন্নয়ন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত তদারকিতে নতুন কাজের সুযোগও তৈরি হতে পারে। ফলে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ শুধু রোবট কতটি কাজ করছে, তার ওপর নির্ভর করবে না; বরং প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং কর্মীদের নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আন্তর্জাতিক রোবোটিকস ফেডারেশন ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক অবস্থানপত্রে রোবটের কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছে। প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি শ্রমবাজারের পরিবর্তন মোকাবিলায় পরিকল্পিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় তাই একটি বিষয় স্পষ্ট, রোবটকে শুধু মানুষের বিকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং কর্মীদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নতুন কাজের উপযোগী করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের প্রশ্ন
মানুষের পাশে রোবট কাজ করলেও নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রোবটের চলাচল, শক্তি প্রয়োগ, ব্যবহৃত সরঞ্জাম এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ অনুযায়ী দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও প্রতিটি পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
এ কারণে রোবট স্থাপনের আগে ঝুঁকি মূল্যায়ন, কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলেও সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে রোবটের সিদ্ধান্ত ভুল হলে বা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে, তা আগেই নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্রে কী পরিবর্তন আসতে পারে?
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষি এবং পণ্য পরিবহন খাতে রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। পোশাক কারখানায় কাপড় কাটার নির্দিষ্ট কাজ, পণ্য গণনা, ভারী মালামাল স্থানান্তর ও মান যাচাইয়ের মতো কাজে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে। তবে কাপড়ের নমনীয়তা, নকশার বৈচিত্র্য এবং হাতে সূক্ষ্ম কাজ করার প্রয়োজনের কারণে সব উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় রোবট ব্যবহার সহজ নয়।
বাংলাদেশের মতো শ্রমনির্ভর অর্থনীতিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ, যন্ত্রপাতি আমদানির ব্যয়, দক্ষ প্রযুক্তিবিদের প্রাপ্যতা এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যয়বহুল রোবট স্থাপন কঠিন হতে পারে। তাই সহজে ব্যবহারযোগ্য ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রযুক্তির বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা, প্রকৌশল প্রশিক্ষণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। কর্মীদের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করা গেলে তারা শুধু যন্ত্রের নির্দেশ অনুসরণকারী নন, বরং প্রযুক্তি পরিচালনা ও উন্নয়নের অংশীদার হিসেবেও গড়ে উঠতে পারবেন।
প্রতিযোগী নয়, সহযোগী হওয়ার ভবিষ্যৎ
কর্মক্ষেত্রে রোবটের আগমন মানুষের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। কিছু কাজ সহজ হবে, কিছু পেশায় পরিবর্তন আসবে, আবার নতুন দক্ষতার চাহিদাও তৈরি হবে। এই পরিবর্তনকে কাজে লাগানোর জন্য প্রযুক্তির উন্নয়নের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং ন্যায্য কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে মানুষ ও রোবটের সম্পর্ক কেমন হবে, তা নির্ধারণ করবে প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্দেশ্য ও নীতিমালা। রোবট যদি মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ ও একঘেয়ে কাজ কমিয়ে দেয়, আর মানুষ সৃজনশীলতা, বিচারবুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে উভয়ের সমন্বয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়তে পারে।
অতএব, রোবটকে মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার পাশাপাশি সহযোগী হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতিও নিতে হবে। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে সাফল্য নির্ভর করবে মানুষ কত দ্রুত নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়, তার ওপর।