
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) স্বয়ংক্রিয় এজেন্ট ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের শতাধিক প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশ করেছেন এক হ্যাকার। এ কাজে তার ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ৫ হাজার ডলার। সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, হ্যাকিংয়ের বেশির ভাগ কাজই হ্যাকার নিজে না করে এআই এজেন্টের মাধ্যমে করিয়েছেন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান নরফোর্জের প্রধান হুমকি গবেষক স্নোরে ফাগারল্যান্ডের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
গবেষকের তথ্য অনুযায়ী, চীনা ভাষায় কথা বলা ওই হ্যাকার ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন ই-কমার্স ওয়েবসাইটে এআই এজেন্ট ব্যবহার করে হামলা চালাতে শুরু করেন। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের আগেই তার এজেন্টগুলো ১ হাজার ২০০টির বেশি ওয়েবসাইটে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। এর মধ্যে শতাধিক প্রতিষ্ঠানের সাইটে সফলভাবে ঢুকতে সক্ষম হয় তারা।
আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষিযন্ত্র নির্মাতা ডিয়ার, গৃহস্থালি পণ্য প্রস্তুতকারক শার্কনিনজা এবং ইঞ্জিন নির্মাতা কামিন্স। তবে এসব অনুপ্রবেশের মাধ্যমে কতটা তথ্য অননুমোদিতভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে পারেননি গবেষকেরা।
মানুষের সামান্য নির্দেশেই স্বয়ংক্রিয় অভিযান
গবেষকেরা জানান, হ্যাকারটি এআই এজেন্টগুলোকে খুব সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা দিয়েছিলেন। চীনা ভাষায় লেখা নির্দেশনার পরিমাণ ছিল ১০০ অক্ষরেরও কম। এরপর এজেন্টগুলো নিজেরাই লক্ষ্যবস্তু ওয়েবসাইটের দুর্বলতা খুঁজে বের করা এবং সেগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা চালায়।
প্রতিটি সফল অনুপ্রবেশে সাধারণত প্রায় ২৩ ঘণ্টা সময় লেগেছে বলে জানান ফাগারল্যান্ড। তার হিসাবে, পুরো অভিযানে এআই ব্যবহারের খরচ হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ডলার, অর্থাৎ প্রতিটি সফল হ্যাকিংয়ে গড়ে ৫০ ডলার।
একটি ঘটনায় এআই এজেন্টগুলো প্রথমে একটি বড় প্রতিষ্ঠানের মূল ওয়েব অ্যাপ্লিকেশনে দুর্বলতা খুঁজে পায়নি। পরে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল নথি বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত অন্য অবকাঠামোর সন্ধান পায় তারা। সেখানকার একটি উন্মুক্ত নিয়ন্ত্রণ প্যানেলের তথ্য প্রক্রিয়াকরণে সূক্ষ্ম ত্রুটি শনাক্ত করে সেটিকে কাজে লাগিয়ে সার্ভারকে অনাকাঙ্ক্ষিত নির্দেশ কার্যকর করতে বাধ্য করার কথা জানায় এজেন্টগুলো।
প্রায় তিন দশক ধরে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ফাগারল্যান্ড বলেন, এআই এজেন্টগুলোর ব্যবহৃত কিছু কৌশল তাকে বিস্মিত করেছে। তার মতে, এ ঘটনা দেখিয়েছে যে স্বয়ংক্রিয় এআই ব্যবস্থা মানুষের ধারাবাহিক তদারকি ছাড়াও জটিল সাইবার হামলা চালাতে সক্ষম হয়ে উঠছে।
আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য
ডিয়ার জানিয়েছে, ঘটনার পর তারা প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে তাদের দাবি, সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
শার্কনিনজা জানিয়েছে, তাদের পণ্য-সহায়তাসংক্রান্ত একটি স্বতন্ত্র ওয়েবসাইটে হামলা হয়েছিল এবং হুমকিটি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। অন্যদিকে, কামিন্স জানিয়েছে, তাদের তৃতীয় পক্ষের একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত ওয়েবসাইটে সম্ভাব্য সাইবার হামলার অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।
গবেষক ফাগারল্যান্ড ইন্টারনেটে উন্মুক্ত অবস্থায় থাকা ‘কেইর্ন’ নামের একটি ওপেন সোর্স এআই প্ল্যাটফর্মের কয়েকটি ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে এ কর্মকাণ্ডের সন্ধান পান। তার দাবি, প্রায় দুই ডজন কেইর্ন ইনস্ট্যান্সে ক্ষতিকর কার্যক্রমের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
প্ল্যাটফর্মটির নির্মাতা জানিয়েছেন, কেইর্ন মূলত সাধারণ সমস্যা সমাধানের জন্য তৈরি করা হয়েছে, হ্যাকিংয়ের জন্য নয়। কেউ এটি ব্যবহার করে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড চালালে তা তার উদ্দেশ্য নয় বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই এজেন্টের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্বলতা শনাক্ত ও সিস্টেমে অনুপ্রবেশের সক্ষমতা বাড়ায় সাইবার হামলার ঝুঁকি আরও জটিল হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে এ প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নজরদারির প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
সূত্র: রয়টার্স