
ছবি: সংগৃহীত
কখনো কখনো মানুষ শুধু চায়, কেউ তার কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনুক। ভেতরে জমে থাকা কষ্টগুলো একটু সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুক। না পারলেও অভিযোগ থাকে না। কিন্তু যখন শোনার কেউ থাকে না, বোঝার কেউ থাকে না, এমনকি বুঝতে চাওয়ার চেষ্টাটুকুও থাকে না, তখন সেই অভাব মানুষকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। কারণ কষ্টের চেয়েও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে এই উপলব্ধি যে, নিজের কষ্টটুকু প্রিয় মানুষের কাছে কোনো অর্থ বহন করে না।
সব কষ্টের সমাধান হয় না। কিছু বেদনা মানুষের ভেতরেই থেকে যায়। সময়ের সঙ্গে তার ভাষা বদলায়, প্রকাশ বদলায়। একসময় মানুষ কথা বলা কমিয়ে দেয়। অথচ নীরবতা মানেই অনুভূতির অবসান নয়। অনেক সময় মানুষ চুপ করে যায়, কারণ একই কথা বারবার বলেও বোঝাতে না পারার ক্লান্তি একসময় কথার চেয়ে ভারী হয়ে ওঠে। তবু কোথাও একটা প্রত্যাশা থেকে যায়—কেউ না কেউ নিশ্চয়ই বুঝবে। পৃথিবীতে অন্তত একজন মানুষ থাকবে, যার কাছে না-বলা কথাগুলোরও একটা অর্থ আছে।
মানুষ তার জীবনের সমস্ত কষ্টের দায়িত্ব অন্য কারও হাতে তুলে দিতে চায় না। শুধু চায়, যার কাছে নিজের দুর্বলতাগুলো প্রকাশ করছে, তার কাছে যেন সেগুলো তুচ্ছ হয়ে না যায়। ভালোবাসার কাছে মানুষ সব সময় সমাধান খোঁজে না, কখনো খোঁজে নিজের অনুভূতির স্বীকৃতি। এই বিশ্বাসটুকু যে, তার আনন্দ, ক্লান্তি, অভিমান কিংবা অনুপস্থিতি অন্য কারও জীবনে কিছুটা হলেও অর্থ বহন করে।
ভালোবাসার মধ্যে মায়া থাকে, যত্ন থাকে, চাওয়া-পাওয়া থাকে, কখনো অপূর্ণতা কিংবা অভিমানও থাকে। সব চাওয়া পূরণ হয় না, সব দূরত্বও ঘোচে না। অথচ কেউ অনেক দূরে থেকেও ভীষণভাবে পাশে থাকতে পারে, আবার প্রতিদিন পাশাপাশি থেকেও দুজন মানুষ একে অন্যের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠতে পারে। কারণ কাছে থাকা আর পাশে থাকা এক বিষয় নয়। একটিতে শারীরিক উপস্থিতি থাকে, অন্যটিতে থাকে অনুভবের গভীরতা।
হয়তো ভালোবাসার সৌন্দর্য এখানেই। কাউকে নিজের মতো করে বদলে ফেলার চেষ্টা না করে তার স্বতন্ত্র অস্তিত্বটুকুকে গ্রহণ করা। তার আনন্দের পাশাপাশি ক্লান্তি, অভিমান, অসম্পূর্ণতা এবং না-বলা বেদনাগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া। এমন এক নিশ্চয়তা হয়ে থাকা, যেখানে মানুষ নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে ভয় পায় না। যেখানে যত্ন অনুগ্রহ নয়, মায়া দায়িত্বের বোঝা নয়, আর ভালোবাসা কেবল পাওয়া-না-পাওয়ার হিসাবেও সীমাবদ্ধ নয়।
সম্পর্ক দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে অভ্যাসে, সামাজিক দায়িত্বে কিংবা একসঙ্গে কাটানো সময়ের ইতিহাসে। কিন্তু ভালোবাসা বেঁচে থাকে পারস্পরিক অনুভবের মধ্যে। সেখানে মতের অমিল থাকতে পারে, দূরত্ব থাকতে পারে, এমনকি দীর্ঘ নীরবতাও। তবু একজন মানুষের কষ্ট অন্যজনের কাছে মূল্যহীন হয়ে যায় না। কারণ ভালোবাসার বিপরীত শুধু ঘৃণা নয়, কখনো কখনো গভীর উদাসীনতাও।
শেষ পর্যন্ত ভালোবাসা হয়তো কাউকে সম্পূর্ণ পাওয়ার নাম নয়। সমস্ত অপূর্ণতা, অভিমান আর দূরত্বের মধ্যেও একে অন্যের কাছে অর্থবহ হয়ে থাকার নাম। এমন এক মায়া, যেখানে কাউকে সবটুকু পাওয়া না গেলেও তার কাছে নিজেকে কখনো অদৃশ্য মনে হয় না।