
টানা বৃষ্টিতে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছিল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রায় ৪৮ ঘণ্টায় শহরটির বিভিন্ন এলাকায় ৩০০ মিলিমিটারের কাছাকাছি বৃষ্টিপাত হয়। এতে সড়ক, বাসাবাড়ি ও দোকানপাট পানিতে তলিয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংককের ৫০টি জেলাকেই দুর্যোগকবলিত এলাকা ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। বন্যায় বিমানবন্দরের যাতায়াত, স্কুল, সড়ক ও গণপরিবহনেও ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে।
তবে ব্যাংককের বন্যায় ৪০ জনের মৃত্যুর তথ্য সঠিক নয়। থাই কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে ৭ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে দেশজুড়ে বন্যায় ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ব্যাংককে মারা যান চারজন। পরে ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে দেশজুড়ে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৮৩ জনে পৌঁছানোর কথা জানানো হয়। এই সংখ্যা পুরো থাইল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যায় মৃত্যুর হিসাব, শুধু ব্যাংককের নয়।
ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্ত ২৬ সেপ্টেম্বর জানান, ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেল থেকে টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ প্রায় ৩০০ মিলিমিটারে পৌঁছায়। শহরের খালগুলো পানিতে পূর্ণ হয়ে উপচে পড়তে শুরু করে। প্রধান সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় কোথাও কোথাও যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। অনেক বাসিন্দাকে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হয়।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২৫ সেপ্টেম্বর ব্যাংককের ৫০টি জেলাকে দুর্যোগকবলিত ঘোষণা করা হয়। বন্যাকবলিত মানুষের আশ্রয়ের জন্য স্কুলসহ বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়। ২৮ সেপ্টেম্বর ব্যাংকক মেট্রোপলিটন প্রশাসন পরিচালিত স্কুলগুলো বন্ধ রাখা হয়। বিমানবন্দর চালু থাকলেও জলমগ্ন সড়ক ও কর্মীদের যাতায়াতে সমস্যার কারণে ফ্লাইট পরিচালনা, চেক-ইন ও লাগেজ ব্যবস্থাপনায় বিঘ্ন ঘটে। বিশেষ করে সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে কর্মীসংকট ও ফ্লাইট বিলম্বের খবর পাওয়া যায়।
বন্যার পানি নামতে শুরু করলে ২৯ সেপ্টেম্বর ব্যাংককের ২১টি জেলা থেকে দুর্যোগ ঘোষণা প্রত্যাহার করা হয়। তবে বাকি ২৯ জেলায় তা বহাল ছিল। থাইল্যান্ডের দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটির ২৯টি প্রদেশ ও ব্যাংককে বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল। এতে ২৬ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা
ব্যাংককের এই বন্যার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা নিয়ে গবেষকেরা বিশ্লেষণ করেছেন। ClimaMeter-এর ১ অক্টোবর প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের ব্যাংকক অঞ্চলের বন্যায় মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত বৈচিত্র্য, দুইয়েরই প্রভাব থাকতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের আবহাওয়ায় বর্তমানে থাইল্যান্ড উপসাগর ও উপকূলীয় অঞ্চলে অতীতের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত এবং প্রায় ৩০ শতাংশ শক্তিশালী বাতাস তৈরি হচ্ছে। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, ওই সময় মধ্য থাইল্যান্ডের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নিম্নচাপের মতো ব্যতিক্রমী আবহাওয়াগত পরিস্থিতি বিরাজ করায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নির্ধারণে তাঁদের আস্থা কম। গবেষণায় বৃষ্টিজনিত ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক ৫ শতাংশ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করতে পারে। একই সঙ্গে উষ্ণ সমুদ্র থেকে বাষ্পীভবন বেড়ে গেলে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতার পরিমাণ বাড়ে। অনুকূল আবহাওয়ায় সেই আর্দ্রতা ঘনীভূত হয়ে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বন্যা বা বৃষ্টিপাতের ঘটনাকে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ফল হিসেবে চিহ্নিত করতে হলে আবহাওয়াগত তথ্যের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের পৃথক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
নগর পরিকল্পনা ও পানি নিষ্কাশনে দুর্বলতা
ব্যাংককের বন্যা নগরটির পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে। থাইল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম দ্য নেশন-এ প্রকাশিত বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে বলা হয়, ৪৮ ঘণ্টায় ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত নগরীর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি করে। এ সময় থাইল্যান্ড উপসাগরে উচ্চ জোয়ার ও শক্তিশালী মৌসুমি বাতাসের কারণে পানি সমুদ্রে নামার পথও বাধাগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বড় ড্রেনেজ টানেল ও পাম্পের ওপর নির্ভর না করে অতিবৃষ্টির ঝুঁকি বিবেচনায় নগর পরিকল্পনা, আগাম সতর্কবার্তা এবং পানি সংরক্ষণ ও নিষ্কাশনের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
ব্যাংককের এই বন্যা দেখিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির পাশাপাশি দ্রুত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি বড় শহরগুলোকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। তাই ভবিষ্যতে এমন দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস, কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।