
ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে রাশিয়ার বিমান হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪২ জনে দাঁড়িয়েছে। সোমবার (২ নভেম্বর) কোমিশুভাখা গ্রামের একটি মানবিক সহায়তা বিতরণকেন্দ্রে চালানো হামলার পর বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এ তথ্য জানিয়েছে ইউক্রেনের পুলিশ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও ৩৩ জন আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকাজ ও নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার শিকার ভবনটি আগে একটি স্কুল ছিল। যুদ্ধের কারণে সেখানে পাঠদান বন্ধ থাকলেও প্রতি সোমবার ভবনটিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে মানবিক সহায়তা বিতরণ করা হতো। একই সঙ্গে এটি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
ইউক্রেনের পুলিশ জানিয়েছে, হামলার পর থেকে উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালাচ্ছেন। তবে ভবনটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হচ্ছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পুলিশ সদস্য ও উদ্ধারকর্মীরাও রয়েছেন। মরদেহের কয়েকটি চেহারা দেখে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে পরিচয় নিশ্চিত করতে স্বজনদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রথম দফায় বিমান থেকে বোমা হামলার পর স্থানীয় লোকজন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেন। পরে সেখানে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়। এতে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিরা হতাহত হন। রয়টার্স জানিয়েছে, হামলায় নিহত এক পুলিশ কর্মকর্তার শরীরে থাকা ক্যামেরার ভিডিও যাচাই করে দেখা গেছে, রেডিওতে সতর্কবার্তা দেওয়ার পর বাসিন্দারা আশ্রয় নেওয়ার সময় দ্বিতীয় দফার হামলায় আশ্রয়কেন্দ্রটি ধ্বংস হয়।
ইউক্রেনের জাতীয় পুলিশ বলেছে, হামলায় প্রায় তিন টন ওজনের এফএবি গ্লাইড বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। এ ধরনের বোমায় প্রায় ১ দশমিক ৪ টন বিস্ফোরক থাকতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলার বিষয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রুশ বাহিনী প্রথমে মানবিক সহায়তা বিতরণের স্থানটিতে হামলা চালায়। পরে আশ্রয় নেওয়া মানুষের ওপর আবারও বোমা ফেলা হয়। তার দাবি, বেসামরিক মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল লক্ষ্য করেই দ্বিতীয় দফার হামলা চালানো হয়েছে।
তবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, কোমিশুভাখা ও আশপাশের দুটি এলাকায় ইউক্রেনের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হয়েছে। রুশ মন্ত্রণালয় বলেছে, ওই হামলায় ইউক্রেনের ২৫ জন পর্যন্ত সেনা নিহত হয়েছে। মস্কো ও কিয়েভ উভয় পক্ষই বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
হামলার পর বুধবার পর্যন্ত ৫৯ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছিলেন জাপোরিঝঝিয়া আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা পরিষদের সহপ্রধান ইভান ফেদোরভ। পরে ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের পর বৃহস্পতিবার নিহতের সংখ্যা ৪২-এ পৌঁছায়। তবে এখনো ৩৩ জন চাপা পড়ে থাকতে পারেন বলে পুলিশ আশঙ্কা করছে।
জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক মানবিক সমন্বয়ক ম্যাথিয়াস শ্মালে ২ নভেম্বরের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছিলেন, মানবিক সহায়তা বিতরণকেন্দ্র ও কাছের আশ্রয়কেন্দ্রে হামলায় বেসামরিক মানুষ এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীরা হতাহত হয়েছেন।
চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বেসামরিক অবকাঠামো ও জনবসতিতে হামলার ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। জাপোরিঝঝিয়ার এই হামলায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, জাতিসংঘের ইউক্রেন কার্যালয়।