News update
  • শাহজালাল বিমানবন্দরের বলাকা লাউঞ্জে আগুন     |     
  • ৯ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে যেসব এলাকায়     |     
  • ড্যাব এর ৩৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সমাবেশে যোগ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান     |     
  • জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনে এনসিপির শীর্ষ নেতারা     |     
  • হরমুজ প্রণালী খুলতে ইরান-ওমান সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে     |     
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা 2026-08-03, 8:18pm

মায়ের গর্ভেই অস্ত্রোপচার, জন্মের আগেই বাঁচল শিশুর জীবন

child-1b7d5726533ab525a8760351e9b5e4151785766680.jpg

মা-বাবার সঙ্গে শিশু থিও


চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন এক মাইলফলক স্থাপন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকেরা। মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই জটিল জন্মগত ত্রুটিতে আক্রান্ত একটি শিশুর সফল অস্ত্রোপচার করেছেন তারা। বিরল এই অস্ত্রোপচারের পর সুস্থভাবে জন্ম নেওয়া পাঁচ মাস বয়সী শিশু থিও এখন স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠছে।


থিওর মা ২৯ বছর বয়সী মেইজি স্যাভেজ লন্ডনের বাসিন্দা। গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহে নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফির সময় চিকিৎসকেরা জানতে পারেন, তার গর্ভের শিশুটি গ্যাস্ট্রোস্কিসিসে আক্রান্ত। এ জন্মগত ত্রুটিতে শিশুর পেটের দেয়াল সঠিকভাবে তৈরি না হওয়ায় অন্ত্রসহ কিছু অভ্যন্তরীণ অঙ্গ শরীরের বাইরে বেরিয়ে থাকে।


পরবর্তী পরীক্ষায় থিওর ক্ষেত্রে সমস্যাটি জটিল ধরনের বলে নিশ্চিত হন চিকিৎসকেরা। এরপর লন্ডনের গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরা মেইজি ও তার স্বামী জশ ফ্রেঞ্চকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস চিলড্রেনস হাসপাতালে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।


বিশ্বে প্রথমবারের মতো পরিচালিত একটি বিশেষ ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের আওতায় এ ধরনের অস্ত্রোপচার পাওয়া তৃতীয় শিশু থিও।


গর্ভেই অস্ত্রোপচার


টেক্সাস চিলড্রেনস হাসপাতালের ভ্রূণ ও শিশু সার্জনদের একটি দল এই অস্ত্রোপচার পরিচালনা করে। দলের নেতৃত্ব দেন প্রসূতি ও ভ্রূণ সার্জারি বিশেষজ্ঞ ড. মাইকেল বেলফোর্ট।


অস্ত্রোপচারের আগে মেইজিকে বেলজিয়ামের লুভেন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে মায়ের জরায়ুর মাধ্যমে ভ্রূণের পেটের দেয়ালে বোটক্স ইনজেকশন দেওয়া হয়, যাতে পেশি শিথিল থাকে এবং অস্ত্রোপচার সহজে করা যায়।


এরপর পরিবারটি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে যায়। গত বছরের নভেম্বরে, গর্ভাবস্থার ২৬তম সপ্তাহে থিওর অস্ত্রোপচার করা হয়।


অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা মায়ের জরায়ুর একটি অংশ বাইরে এনে ভ্রূণকে উপযুক্ত অবস্থানে স্থাপন করেন। এরপর জরায়ুর ভেতরের অ্যামনিয়োটিক তরল বের করে তার পরিবর্তে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস প্রবেশ করানো হয়। এতে চিকিৎসকদের কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা তৈরি হয়।


পরে কিহোল সার্জারির মাধ্যমে শিশুটির শরীরের বাইরে থাকা অন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গ ধীরে ধীরে পেটের ভেতরে স্থাপন করা হয়। এরপর ক্ষতস্থান সেলাই করে বন্ধ করে দেওয়া হয়।


অস্ত্রোপচারের পর মেইজির শরীরে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের চেয়েও বড় ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয়। তারপরও তাকে আরও ১৪ সপ্তাহ গর্ভে সন্তান বহন করতে হয়েছে।


মেইজি বলেন, ‘সেরে ওঠাটা খুব কঠিন ছিল। থিও প্রায়ই নড়াচড়া করত, ফলে ক্ষতস্থানে ব্যথা হতো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব কষ্টই সার্থক হয়েছে।’


নির্ধারিত সময়েই জন্ম, সুস্থ থিও


অস্ত্রোপচার সফল হওয়ায় মেইজির গর্ভধারণ নির্ধারিত সময় পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে টেক্সাসেই স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে জন্ম নেয় থিও।


বর্তমানে পাঁচ মাস বয়সী শিশুটি সুস্থ রয়েছে এবং স্বাভাবিক শিশুর মতোই বেড়ে উঠছে।


ড. মাইকেল বেলফোর্ট বলেন, ‘মা, শিশু, অস্ত্রোপচারের সময় এবং পুরো প্রক্রিয়া—সবকিছুই অসাধারণ ছিল। ভ্রূণের ওপর অস্ত্রোপচারের সময় বা পরে কোনো জটিলতা দেখা দেয়নি।’


জটিল গ্যাস্ট্রোস্কিসিসে ঝুঁকি বেশি


চিকিৎসকদের মতে, যুক্তরাজ্যে প্রতি তিন হাজার নবজাতকের মধ্যে প্রায় একজন গ্যাস্ট্রোস্কিসিস নিয়ে জন্মায়। সাধারণত এসব শিশুকে জন্মের পর কয়েক সপ্তাহ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখতে হয়। তাদের টিউব বা শিরার মাধ্যমে পুষ্টি দিতে হয় এবং জন্মের পর অস্ত্রোপচার করা হয়।


তবে জটিল গ্যাস্ট্রোস্কিসিসে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। তাদের ছয় মাস পর্যন্ত নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকতে হতে পারে। একাধিক অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে এবং দীর্ঘ সময় শিরার মাধ্যমে পুষ্টি দিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে অন্ত্র প্রতিস্থাপনেরও প্রয়োজন পড়ে। উন্নত চিকিৎসা সত্ত্বেও প্রতি ১০ জনে একজন শিশুর মৃত্যু হতে পারে।


যুক্তরাজ্যেও চালু হতে পারে পদ্ধতিটি


গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক পাওলো ডে কপ্পি জানান, চলমান ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফল হলে শিগগিরই যুক্তরাজ্যেও এ ধরনের অস্ত্রোপচার চালু হতে পারে।


তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, অদূর ভবিষ্যতে আরও অনেক রোগীকে এই চিকিৎসাসেবা দিতে পারব।’


ড. বেলফোর্টও মনে করেন, ভবিষ্যতে চিকিৎসা প্রযুক্তির আরও উন্নতি হলে মায়ের গর্ভেই ভ্রূণের হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের কিছু জটিল অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হতে পারে।


বর্তমানে লন্ডনে পরিবারের সঙ্গে রয়েছে থিও। তার মা মেইজি বলেন, চিকিৎসকেরা যে অস্ত্রোপচার করেছেন, তাতে তার সন্তানের জীবনের শুরুটাই বদলে গেছে। এখন থিও একেবারে স্বাভাবিক শিশুর মতো বেড়ে উঠছে।


থিওর বাবা জশ বলেন, ‘আমরা নিজেদের খুবই ভাগ্যবান মনে করি। চিকিৎসকেরা শুধু আমাদের সন্তানের জীবনই বদলে দেননি, আমাদের পুরো পরিবারকে নতুন জীবন দিয়েছেন। এত কঠিন সময়ে তারা যেভাবে পাশে ছিলেন, তা আমরা কোনো দিন ভুলব না।’


সূত্র: বিবিসি