
ছবি: সংগৃহীত
করোনাভাইরাসের টিকা তৈরিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা মেসেঞ্জার আরএনএ বা mRNA প্রযুক্তি এবার ইনফ্লুয়েঞ্জার বিরুদ্ধে লড়াইয়েও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মডার্না প্রবীণদের জন্য তৈরি করেছে mRNA-ভিত্তিক নতুন ফ্লু টিকা mFlusiva (mRNA-1010)। প্রাথমিক পরীক্ষায় প্রচলিত ডোজের ফ্লু টিকার তুলনায় এটি বেশি কার্যকর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করেছে বলে পরীক্ষার ফলাফলে উঠে এসেছে।
তবে এটি ফ্লু ‘সারানোর’ ওষুধ নয়; বরং ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর জন্য তৈরি একটি প্রতিরোধমূলক টিকা। মডার্না টিকাটির অনুমোদনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA)-এর কাছে আবেদন করেছে। ২০২৬ সালের জুনে FDA-এর ভ্যাকসিন-সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি টিকাটির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিয়ে পর্যালোচনা করেছে।
তিন ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা লক্ষ্য
mFlusiva একটি trivalent mRNA vaccine। এতে তিনটি mRNA উপাদান রয়েছে, যা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের হিম্যাগ্লুটিনিন (HA) প্রোটিনের বিরুদ্ধে শরীরের রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে কাজ করে। টিকাটি ইনফ্লুয়েঞ্জা A-এর H1N1 ও H3N2 এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা B-এর Victoria lineage লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। এক ডোজে মোট ৩৭.৫ মাইক্রোগ্রাম mRNA ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
mRNA প্রযুক্তির বিশেষত্ব হলো, এতে সরাসরি ভাইরাসকে শরীরে প্রবেশ করানোর পরিবর্তে শরীরের কোষকে নির্দিষ্ট ভাইরাসের প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সেই প্রোটিনকে শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
প্রবীণদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। ফলে ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো সাধারণ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও বয়স্কদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কিংবা মৃত্যুর মতো গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে।
FDA-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জায় প্রায় ৩০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ গুরুতর অসুস্থ হন এবং সর্বোচ্চ প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রেও প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জায় লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হন।
এই বাস্তবতায় প্রবীণদের জন্য আরও শক্তিশালী ও কার্যকর ফ্লু টিকা তৈরির প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।
৫০ বছরের বেশি বয়সীদের লক্ষ্য করে পরীক্ষা
মডার্না mRNA-1010-এর অনুমোদনের জন্য ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ওপর বড় পরিসরে পরীক্ষা চালিয়েছে। প্রধান ফেজ-৩ গবেষণায় ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী ৪০ হাজার ৭০৩ জন অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের নিয়ে পৃথক ফেজ-৩ গবেষণায় প্রায় ২ হাজার ৯৯২ জন অংশ নেন। চারটি ফেজ-৩ গবেষণার সমন্বিত নিরাপত্তা বিশ্লেষণে ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী ৭১ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারীর তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে।
মডার্নার জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড-ডোজ ফ্লু টিকার তুলনায় mRNA-1010 ইনফ্লুয়েঞ্জা-সম্পর্কিত অসুস্থতা প্রতিরোধে বেশি কার্যকারিতা এবং উন্নত রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রার প্রচলিত ফ্লু টিকার সঙ্গেও তুলনা করা হয়েছে।
দ্রুত টিকা তৈরির সম্ভাবনা
mRNA প্রযুক্তির আরেকটি বড় সুবিধা হলো—প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় টিকা তৈরির প্রক্রিয়া দ্রুত করা সম্ভব। প্রচলিত কিছু ফ্লু টিকা তৈরিতে ডিম বা কোষ-সংস্কৃতির মাধ্যমে ভাইরাস উৎপাদনের প্রয়োজন হয়। mRNA-ভিত্তিক প্রযুক্তিতে সেই প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয় না। ফলে নতুন মৌসুমে কোন ধরনের ভাইরাস বেশি ছড়াচ্ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তুলনামূলক দ্রুত টিকার উপাদান পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। ফলে একটি মৌসুমের টিকা পরবর্তী মৌসুমে একই মাত্রায় কার্যকর নাও হতে পারে। ২০২৬-২৭ মৌসুমের জন্যও FDA ইতোমধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জা A ও B-এর নির্দিষ্ট ভাইরাস স্ট্রেন নির্বাচন করেছে।
কোভিডের পর ফ্লু, এরপর আরও বড় সম্ভাবনা
mRNA প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পায় কোভিড-১৯ মহামারির সময়। এরপর এই প্রযুক্তিকে ক্যানসার, RSV, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে প্রয়োগের গবেষণা জোরদার হয়। মডার্নার নিজস্ব গবেষণা তালিকাতেও ফ্লু টিকা, ফ্লু-কোভিড যৌথ টিকা এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের রোগের mRNA টিকা উন্নয়নের কর্মসূচি রয়েছে।
মডার্না জানুয়ারিতে জানিয়েছিল, mRNA-1010-এর জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় অনুমোদনের আবেদন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ৫০ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের জন্য সাধারণ অনুমোদন এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য দ্রুত অনুমোদনের পথ চাওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, এখনই এটিকে সবার জন্য অনুমোদিত ‘ফ্লুর টিকা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে পরীক্ষার ফলাফল ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনা সফল হলে প্রবীণদের জন্য এটি প্রচলিত ফ্লু টিকার একটি নতুন বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। আর সফল হলে ভবিষ্যতে দ্রুত পরিবর্তনশীল ভাইরাসের বিরুদ্ধে mRNA প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।