News update
  • প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মহেশখালীর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়লেন     |     
  • বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ১৫তম     |     
  • হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতে ইরানের ছয় শর্ত     |     
  • দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করুন: ইউএনওদের প্রধানমন্ত্রী     |     
  • রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লড়বে জামায়াত, রোববার প্রার্থী ঘোষণা     |     
বঙ্গলোক ডেস্ক সাহিত্য ও সাময়িকী 2026-08-06, 8:08pm

বাংলাদেশি আলেমের ১৭ খণ্ডের আরবি হাদিস-ব্যাখ্যা গ্রন্থে মুগ্ধ আরব বিশ্ব

abdul-matin-e5220e40eea904df1b9fe87b09b9e6e51786025315.jpg


বাংলাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস, জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার সিনিয়র শিক্ষক মাওলানা আব্দুল মতিনের দীর্ঘ ২৫ বছরের গবেষণা, অধ্যবসায় ও পাঠদানের অভিজ্ঞতার ফসল ‘কিফায়াতুল মুগতাযি ফি শারহি জামে তিরমিজি’—তিরমিজি শরিফের ওপর রচিত ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ আরবি ব্যাখ্যাগ্রন্থ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশের পর থেকেই গ্রন্থটি আরব বিশ্বসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ আলেম, গবেষক ও হাদিসবিশারদদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেকেই একে সমকালীন হাদিস গবেষণায় বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে অভিহিত করেছেন।


বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশের উদ্যোগে ‘হাদিস অনুসরণে সালাফের কর্মপন্থা: প্রসঙ্গ জামে তিরমিজি ও কিফায়াতুল মুগতাযি’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক ইলমি সেমিনারে গ্রন্থটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ, ভারত, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের খ্যাতিমান আলেম, মুহাদ্দিস, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।


তিরমিজির গবেষণা-ঐতিহ্যের আধুনিক উপস্থাপন


অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা আবুল কাসেম নোমানি বলেন, ইমাম তিরমিজি তাঁর ‘জামে তিরমিজি’ গ্রন্থে শুধু হাদিস সংকলন করেননি; বরং ফকিহদের মতপার্থক্য, দলিলের বিশ্লেষণ এবং ফিকহি আলোচনাকে অত্যন্ত অনন্যভাবে উপস্থাপন করেছেন।


তিনি বলেন, মাওলানা আব্দুল মতিন দীর্ঘ গবেষণা, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, নির্ভরযোগ্য সূত্র এবং আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির সমন্বয়ে সেই ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর রচিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।


‘এটি শুধু শরহ নয়, গবেষণার পূর্ণাঙ্গ মডেল’


সভাপতির বক্তব্যে শায়খুল হাদিস মাওলানা আবুল বাশার বলেন, ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’ শুধু একটি শরহ নয়; এটি হাদিস পাঠদান, গবেষণা এবং দরস পরিচালনার একটি পূর্ণাঙ্গ মডেল। তিনি মনে করেন, এই গ্রন্থ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আলেম ও গবেষকদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।


জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মাওলানা আব্দুল মালেক বলেন, ইতিহাসে তিরমিজি শরিফের বহু ব্যাখ্যাগ্রন্থ অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়ে গেছে। কিন্তু ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি হাদিসের ধারাবাহিক, বিশ্লেষণধর্মী ও প্রামাণ্য ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। একইসঙ্গে এতে সালাফে সালেহিনের মানহাজ, মতভিন্নতার শিষ্টাচার এবং গবেষণার ভারসাম্য অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।


২৫ বছরের গবেষণার গল্প


নিজের গবেষণা-যাত্রার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গ্রন্থকার মাওলানা আব্দুল মতিন বলেন, ২০০১ সালে মালিবাগ মাদরাসায় তিরমিজি শরিফ পাঠদানের প্রয়োজন থেকেই তাঁর গবেষণার সূচনা।


তিনি জানান, সে সময় প্রয়োজনীয় গ্রন্থ কেনার সামর্থ্য না থাকায় বিভিন্ন লাইব্রেরি থেকে বই সংগ্রহ করে নোট প্রস্তুত করতেন। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় দীর্ঘ কয়েক মাস একনিষ্ঠভাবে গবেষণায় সময় দিয়ে গ্রন্থটির কাজকে অনেক দূর এগিয়ে নিতে সক্ষম হন। দীর্ঘ ২৫ বছরের শ্রম, তথ্য-সংগ্রহ, তুলনামূলক বিশ্লেষণ এবং সম্পাদনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ১৭ খণ্ডের এই ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রকাশ সম্ভব হয়েছে।


একটি শব্দের অর্থ নির্ধারণেও শত শত গ্রন্থ পর্যালোচনা


জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার নায়েবে মুহতামিম মাওলানা আব্দুল গাফফার জানান, গ্রন্থের একটি শব্দের সঠিক অর্থ নির্ধারণের জন্যও লেখক শত শত প্রামাণ্য গ্রন্থ পর্যালোচনা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, ভবিষ্যতে তিরমিজি শরিফ নিয়ে উচ্চতর গবেষণার ক্ষেত্রে এই গ্রন্থ একটি নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হবে।


মুআসসাসা ইলমিয়্যাহ বাংলাদেশের পরিচালক শায়খ তাহমিদুল মাওলা বলেন, প্রথম চার খণ্ড প্রকাশের পরই দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা-মান বজায় রেখে আরব বিশ্বের আদলে ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ প্রকাশ করা হয়েছে।


আরব বিশ্বের আলেমদের প্রশংসা


সেমিনারে সৌদি আরবের ড. শায়খ আব্দুল আজিজ আলহাজ, দক্ষিণ আফ্রিকার শায়খ ইসহাক বানা এবং ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দের শুরা সদস্য শায়খ হাসান মাহমুদ রাজস্থানীসহ দেশ-বিদেশের একাধিক আলেম গ্রন্থটির গবেষণাগত গভীরতা, প্রামাণিকতা এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন।


তাঁদের মতে, ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’ শুধু একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ নয়; বরং সমকালীন হাদিসচর্চা ও গবেষণার জন্য একটি মূল্যবান আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা-সম্পদ।


১০০ শিক্ষার্থীকে উপহার


হাদিস গবেষণায় নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে অনুষ্ঠানে নির্বাচিত ১০০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীর হাতে ‘কিফায়াতুল মুগতাযি’-এর ১৭ খণ্ডের পূর্ণাঙ্গ সেট বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হয়।


প্রকাশনা-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশি একজন আলেমের রচিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ আরবি ভাষার তিরমিজি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ, যা আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে দীর্ঘ সম্পাদকীয় পর্যালোচনা, গবেষণা ও নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটির শুরুতেই বিশ্বের বিভিন্ন খ্যাতিমান আলেমের মূল্যায়ন সংযোজিত হওয়ায় এর গ্রহণযোগ্যতা ও গবেষণামূল্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।


বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকাশনা কেবল একটি নতুন গ্রন্থের আত্মপ্রকাশ নয়; বরং আন্তর্জাতিক হাদিস গবেষণার অঙ্গনে বাংলাদেশের জ্ঞানচর্চা, গবেষণা-ঐতিহ্য এবং আলেমসমাজের সক্ষমতার এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর। আরব বিশ্বে গ্রন্থটির ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে, ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।