
উত্তরের জেলা নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী ইউনিয়নের ভেড়ভেড়ি গ্রামের ঐতিহাসিক চাঁদ খোসাল মসজিদ আজও বহন করে চলেছে শত বছরের ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্মৃতি। স্থানীয়ভাবে প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এই মসজিদটি শুধু মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের স্থান নয়, প্রাচীন স্থাপত্যকলারও একটি অনন্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ সময় ধরে ধর্মীয় আবেগ ও মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই মসজিদে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন। অনেকে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি মানত ও ইচ্ছা পূরণের আশায় মসজিদে বিভিন্ন ধরনের দান করে থাকেন।
এই ঐতিহাসিক মসজিদের দানবাক্স ছয় মাস পর খোলা হলে সেখানে পাওয়া গেছে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৪২৯ টাকা। বুধবার (২৯ জুলাই) দুপুরে জোহরের নামাজের পর মসজিদটির দানবাক্স খোলা হয়। পরে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুর রহমানের উপস্থিতিতে মুসল্লিরা দানবাক্সের টাকা গণনা করেন।
গণনা শেষে দানবাক্স থেকে নগদ ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৪২৯ টাকা পাওয়া যায়। একই সময়ে গত ছয় মাসে বিভিন্ন দানসামগ্রী থেকে পাওয়া অর্থের হিসাবও করা হয়। মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দান করা বিভিন্ন জিনিসপত্রের মূল্য প্রায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মসজিদের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে ১০ লাখ ৮ হাজার ৪২৯ টাকা জমা করা হয়েছে।
শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী
স্থানীয়দের কাছে চাঁদ খোসাল মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়; এটি এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে নানা সময়ের পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদটি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় মুসল্লিরা এই মসজিদে নামাজ আদায় করে আসছেন।
প্রাচীন এই মসজিদের স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী স্থানীয় মানুষের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে। সময়ের সঙ্গে চারপাশে আধুনিক স্থাপনা গড়ে উঠলেও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে চাঁদ খোসাল মসজিদ এখনও স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রেখেছে। পুরোনো স্থাপত্যের স্মৃতি বহন করা এই মসজিদ দেখতে এবং নামাজ আদায় করতে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসেন বলে স্থানীয়রা জানান।
মসজিদকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসও দীর্ঘদিনের। মুসল্লিরা নামাজ আদায়ের পাশাপাশি নিজেদের বিভিন্ন মানত ও ইচ্ছা পূরণের আশায় মসজিদে দান করেন। এসব দানের মধ্যে নগদ অর্থের পাশাপাশি হাঁস, মুরগি, কবুতর, ছাগল, গরু ও স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন সামগ্রী রয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে দানবাক্সে জমতে থাকে মানুষের দেওয়া অর্থ।
ছয় মাস পর খুলল দানবাক্স
মসজিদ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, নিয়ম অনুযায়ী ছয় মাস পর বুধবার দানবাক্সটি খোলা হয়। জোহরের নামাজের পর মসজিদের সভাপতি, ক্যাশিয়ার ও মুসল্লিদের উপস্থিতিতে দানবাক্স থেকে টাকা বের করা হয়। পরে সবার সামনে তা গণনা করা হয়।
গণনা শেষে নগদ ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৪২৯ টাকা পাওয়া যায়। এর সঙ্গে গত ছয় মাসে বিভিন্ন দানসামগ্রী থেকে পাওয়া অর্থ যোগ করে মসজিদের ব্যাংক হিসাবে মোট ১০ লাখ ৮ হাজার ৪২৯ টাকা জমা করা হয়েছে।
মসজিদের ক্যাশিয়ার মজনুর রহমান বলেন, ‘বুধবার জোহরের নামাজের পর মসজিদের দানবাক্স খোলা হয়। মসজিদের সভাপতি ও মুসল্লিদের উপস্থিতিতে টাকা গণনা করে ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৪২৯ টাকা পাওয়া গেছে। এছাড়া গত ছয় মাসে দান করা বিভিন্ন জিনিসপত্রের মূল্য প্রায় ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মসজিদের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে ১০ লাখ ৮ হাজার ৪২৯ টাকা জমা করা হয়েছে।’
মসজিদের উন্নয়নে ব্যয় হবে অর্থ
চাঁদ খোসাল মসজিদের সভাপতি ও কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুর রহমান বলেন, দানবাক্স থেকে পাওয়া টাকা মসজিদের নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয়েছে। পরবর্তীতে মসজিদের উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় কাজে এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কারণে চাঁদ খোসাল মসজিদকে আরও সংরক্ষণ ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন প্রাচীন এই ধর্মীয় স্থাপনাটির ঐতিহ্য রক্ষা পাবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও মসজিদটির ইতিহাস ও স্থাপত্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।
প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো এই মসজিদকে ঘিরে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্য এখনও অটুট। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মসজিদটির অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এলেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং মানুষের সঙ্গে এর সম্পর্ক আজও অটুট রয়েছে। আর সেই দীর্ঘদিনের মানুষের ভালোবাসা ও দানেরই যেন প্রতিফলন ঘটেছে ছয় মাস পর খোলা দানবাক্সে পাওয়া ৬ লাখ ৬৩ হাজার ৪২৯ টাকায়।