
বাংলাদেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এখন আর সাময়িক কোনো সংকট নয়; এটি সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া শ্রমজীবী, নিম্ন আয়ের মানুষ, নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসারের ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। অনেক পরিবারকে সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ঋণ নিয়ে জীবনযাপন করতে হচ্ছে। অথচ কেন বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, তার কারণ সাধারণ মানুষও কমবেশি জানেন। কিন্তু রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী মহল বিষয়টি জানার পরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে কেবল উৎপাদন ব্যয় বা আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব দায়ী নয়। বরং উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খলে বিভিন্ন স্তরে অযৌক্তিক মুনাফা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজিই মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে উপস্থাপিত ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক গবেষণায় বাজারের এই বাস্তব চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত কমিশন, অবৈধ আদায়, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন পর্যায়ে চাঁদাবাজির কারণে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, কৃষকের কাছ থেকে যে চাল প্রায় ৩০ টাকা ৬৫ পয়সা কেজি দরে সংগ্রহ করা হয়, সেটিই খুচরা বাজারে প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। শুধু চাল নয়, শাকসবজি, মাছ, ডিম, পেঁয়াজ, আলু, ভোজ্যতেলসহ প্রায় সব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রেই একই চিত্র দেখা যায়। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগী যুক্ত থাকায় প্রতিটি স্তরে মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত দাম গুনতে হচ্ছে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাজার ব্যবস্থার এই অসংগতি ও অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের মোট উপার্জনের প্রায় ৬০ শতাংশই খাদ্য ক্রয়ে ব্যয় হচ্ছে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান কিংবা অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বাস্তব মজুরি কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে কিংবা ধারদেনা করে সংসার চালাতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশে দারিদ্র্যের হার আরও বাড়বে এবং খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুতদারি, পরিবহন পথে চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেটের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ না করলে দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। গবেষণায় বিভিন্ন পর্যায়ে অসাধু ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী, প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ও উঠে এসেছে, যা বাজার ব্যবস্থাকে আরও অকার্যকর করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ বা আলোচনা সভা আয়োজন করে এই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাস্তবভিত্তিক কার্যকর পদক্ষেপ। মধ্যস্বত্বভোগীদের সংখ্যা কমিয়ে কৃষককে সরাসরি বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আধুনিক কৃষক বাজার গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে কৃষক যেন সরাসরি পাইকারি ও জাতীয় বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারেন, সেই সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষকদের আরেকটি বড় সমস্যা হলো সংরক্ষণ সুবিধার অভাব। পর্যাপ্ত হিমাগার ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় মৌসুমে বাধ্য হয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়। পরে সেই একই পণ্য মজুত করে কয়েক গুণ বেশি দামে বাজারে ছাড়া হয়। তাই দেশব্যাপী আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণ অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি কৃষি উপকরণে ভর্তুকি, সহজ ঋণ এবং উন্নত সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া বাজার তদারকি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে। শুধু অভিযানের ছবি প্রকাশ বা লোকদেখানো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা নয়, বরং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অবৈধ মজুতদারি, চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত, স্বচ্ছ সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কৃষক-ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি এখন সামাজিক স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি জাতীয় ইস্যু। তাই সময় থাকতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর আরও গভীরভাবে পড়বে। এখন গবেষণা নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত উদ্যোগ, কঠোর নজরদারি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।