
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে সতর্ক করে আসছিলেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মীরা। তাদের আশঙ্কা ছিল, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ না থাকায় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত তথ্য ও গবেষণার বিবরণ বাইরের ব্যক্তি, এমনকি বিদেশি সরকারের হাতেও চলে যেতে পারে। তবে কর্মীদের এসব উদ্বেগ যথাযথ গুরুত্ব পেয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ও বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত পাঁচ ব্যক্তির বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের শেষ দিকে চ্যাটজিপিটি চালুর আগেই ওপেনএআইয়ের কয়েকজন কর্মী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও পরিচালনা পর্ষদের কাছে নিরাপত্তাব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতা তুলে ধরেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, গুগল ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল। নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিল।
এক জায়গায় কোড সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ
ওপেনএআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে কর্মীদের অন্যতম উদ্বেগ ছিল প্রতিষ্ঠানের কোড সংরক্ষণের পদ্ধতি। অধিকাংশ কোড একটি বড় সংগ্রহস্থলে রাখা হতো, প্রযুক্তি খাতে যাকে 'মনোরেপো' বলা হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানের কোডে প্রবেশাধিকার থাকা কর্মীরা তাদের দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, এমন অনেক প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বিবরণও দেখতে পারতেন।
কর্মীদের আশঙ্কা ছিল, এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যক্তি বা সাইবার হামলাকারীরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। বিশেষ করে বর্তমানে উন্নত এআই এজেন্ট বিপুল পরিমাণ কোড ও নথি দ্রুত বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হওয়ায় এ ধরনের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের গবেষণাসংক্রান্ত অনেক নথি গিটহাব ও স্ল্যাকের মতো প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা হতো। এগুলোর প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন কর্মীদের কেউ কেউ।
তবে ওপেনএআই জানিয়েছে, তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল প্রযুক্তিগত কাজ আলাদা কোড সংগ্রহস্থলে কঠোর প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সুরক্ষিত রাখা হয়। মনোরেপোতে প্রতিষ্ঠানের সব কোড কিংবা মডেলের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নেই। বিশেষ করে মডেলের আচরণ নির্ধারণকারী সংখ্যাগত উপাদান বা 'মডেল ওয়েটস' সেখানে সংরক্ষিত থাকে না।
অভ্যন্তরীণ টুলের নিরাপত্তা যাচাইয়েও ঘাটতি
প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের নিরাপত্তা যাচাই নিয়েও উদ্বেগ ছিল। গবেষকেরা নতুন মডেলের সক্ষমতা পরীক্ষা ও ত্রুটি শনাক্ত করতে বিভিন্ন স্যান্ডবক্স ব্যবহার করেন। এসব টুলে কর্মীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন আনলেও সব পরিবর্তনের নিরাপত্তা পরীক্ষা নিয়মিত করা হতো না বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তিনজনের বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যালোচনার অভাবে এসব সরঞ্জামে দুর্বলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এর সুযোগ নিয়ে বাইরের কেউ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে পারত।
ওপেনএআই জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি এখন অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যালোচনা করছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রধান তথ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা ডেন স্টাকির দায়িত্ব নেওয়ার পর নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হয়েছে।
নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষে গোপন রেকর্ডিং যন্ত্র
ওপেনএআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় গত অক্টোবরে। তখন প্রতিষ্ঠানটির এক নির্বাহী কর্মকর্তার সম্মেলনকক্ষে গোপনে শব্দ ধারণের যন্ত্র স্থাপনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৩ অক্টোবর ফেডারেল এজেন্টরা সৌদি আরবের নাগরিক ও ওপেনএআইয়ের তৎকালীন প্রকৌশলী আবদুর রহমান আলফোজানকে গ্রেপ্তার করেন। তার বিরুদ্ধে নির্বাহী কর্মকর্তাদের সম্মেলনকক্ষে টিস্যু পেপারের মধ্যে লুকানো রেকর্ডিং যন্ত্র স্থাপনের অভিযোগ আনা হয়।
আদালতে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, ওই প্রকৌশলী ওপেনএআইয়ের কর্মীদের ব্যবহারের জন্য তৈরি একটি অভ্যন্তরীণ এআই টুল ব্যবহার করে সৌদি আরবে নির্বাহী কর্মকর্তাদের সফরসংক্রান্ত তথ্য খুঁজেছিলেন। সৌদি মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে ওপেনএআইয়ের কোন কর্মকর্তারা অংশ নিতে পারেন, সে বিষয়েও তথ্য অনুসন্ধান করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই প্রকৌশলীর সঙ্গে সৌদি রাজপরিবারের একজন সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ওই ব্যক্তি তাকে সৌদি আরবে নতুন একটি এআই উদ্যোগে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তের আইনজীবীরা এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
আগেও ফাঁস ও সাইবার হামলার ঘটনা
ওপেনএআইয়ের নিরাপত্তা দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগের পেছনে আগের কয়েকটি ঘটনাও রয়েছে। ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির জিপিটি-৪ মডেলসংক্রান্ত গোপন তথ্য চুরির ঘটনা ঘটে। সে সময় এক বহিরাগত ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের স্ল্যাক চ্যানেলে প্রবেশ করে তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। ওপেনএআইয়ের দাবি, ওই ব্যক্তি শুধু প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীর জন্য উন্মুক্ত চ্যানেলগুলোতেই প্রবেশ করতে পেরেছিলেন।
এ ছাড়া চলতি বছরের গ্রীষ্মে ওপেনএআইয়ের পরীক্ষাধীন এআই এজেন্টগুলো এআই প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসের ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছিল। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের নজরে আসে।
সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান হ্যাকট্রন এআইয়ের তিন গবেষকও জুলাই মাসে অ্যানথ্রপিকের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী এআই মডেল ব্যবহার করে ওপেনএআইয়ের কয়েকজন কর্মীর চ্যাটজিপিটি অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে সক্ষম হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কিছু ব্যবস্থায়, এমনকি মনোরেপোতেও প্রবেশাধিকার পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর একটি ফেডারেল জুরি গুগলের সাবেক এক কর্মীকে এআই প্রযুক্তিসংক্রান্ত হাজার হাজার পৃষ্ঠা গোপন তথ্য চুরির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। ওই কর্মীর বিরুদ্ধে চীনের হয়ে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ ছিল।
অক্টোবরের শেষ দিকে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ক্যাথেড্রাল সিস্টেমস অ্যানথ্রপিকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় প্রবেশের দাবি করে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের স্ল্যাক চ্যানেলে এআই মডেলের সংবেদনশীল তথ্য নিয়ে আলোচনা পাওয়া যায় বলে জানায় তারা। অ্যানথ্রপিক অবশ্য বলেছে, সেখানে পাওয়া তথ্যের মধ্যে গ্রাহক ও অংশীদারদের যোগাযোগসংক্রান্ত কিছু তথ্য এবং সাধারণ ব্যবহারকারী অ্যাকাউন্টের নথি ছিল।
নিরাপত্তা জোরদারে নতুন উদ্যোগ ওপেনএআইয়ের
ওপেনএআইয়ের মুখপাত্র এলানা উইডম্যান জানিয়েছেন, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সাইবার হামলার লক্ষ্যবস্তুতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ওপেনএআই। অভ্যন্তরীণ ব্যক্তি, সাইবার অপরাধী এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের হামলা থেকে প্রযুক্তি, তথ্য ও কর্মীদের সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক বিনিয়োগ করছে।
তিনি বলেন, প্রযুক্তি ও হুমকির ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ঝুঁকি শনাক্ত ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতারই প্রমাণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আগস্টে ওপেনএআইয়ের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী থিবো সত্তিওর নেতৃত্বে নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন পর্যায়ের প্রকৌশলীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশকে নিরাপত্তা উন্নয়নের কাজে পুনর্নিয়োগ করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনের পর প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কার্যক্রম বা 'সিকিউরিটি স্প্রিন্ট' শুরুর পরিকল্পনার কথাও জানায়।
এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ভারসাম্য রক্ষা এখন পুরো শিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। গবেষণায় উন্মুক্ত পরিবেশ ও দ্রুত উদ্ভাবন নতুন প্রযুক্তি তৈরিতে সহায়তা করলেও অতিরিক্ত উন্মুক্ততা গোপন তথ্যের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ওপেনএআইয়ের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই চ্যালেঞ্জকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
সূত্র: রয়টার্স।