
মজুরি কাঠামো পুনর্নির্ধারণে মজুরি বোর্ডের উদ্যোগের পরও পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ থামেনি। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকার আশুলিয়ায় নতুন করে বিক্ষোভে নেমে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এদিন শিল্পাঞ্চলটিতে শতাধিক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
শনিবার থেকে শুরু হওয়া শ্রমিক অসন্তোষের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কয়েক দিন ধরে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে শত শত কারখানা বন্ধ হয়েছে। রপ্তানি পণ্য সময়মতো পাঠানো নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ দিলেও পরে তারা কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। প্রস্তাবিত মজুরি বৃদ্ধির পরিমাণ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করার দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করেন শ্রমিকেরা।
আশুলিয়া শিল্প পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে শিল্পাঞ্চলজুড়ে অতিরিক্ত পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে সাভার ও গাজীপুরের মতো অন্য শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল। এসব এলাকার অনেক শ্রমিক কাজে ফিরেছেন। যদিও কিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মজুরি বৃদ্ধির অঙ্ক এখনো চূড়ান্ত হয়নি
শ্রমিকদের বিক্ষোভের মধ্যে বুধবার নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণে গঠিত মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে ডিসেম্বর থেকে সংশোধিত মজুরি কাঠামো কার্যকরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। নতুন কাঠামো অনুযায়ী প্রথম বেতন শ্রমিকেরা জানুয়ারিতে পাবেন। তবে ন্যূনতম মজুরি কত টাকা বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। শ্রমিকেরা তা বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন। তাদের যুক্তি, খাদ্য, বাসাভাড়া ও যাতায়াতসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর খরচ বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে মজুরি বাড়েনি। ফলে বর্তমান বেতনে সংসারের মৌলিক চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
পোশাকশ্রমিক শিলপি খাতুন বলেন, সবকিছুর দাম বেড়েছে, কিন্তু বেতন বাড়েনি। সংসারের খরচ মেটানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।
রপ্তানি ও উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরি পোশাকশিল্পের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ শিল্প থেকে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে এই খাতের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
এই শিল্পের পণ্য কেনে এইচঅ্যান্ডএম, জারা ব্র্যান্ডের মালিক প্রতিষ্ঠান ইন্ডিটেক্স এবং ওয়ালমার্টের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে বসন্ত ও গ্রীষ্ম মৌসুমের রপ্তানি আদেশের জন্য কারখানাগুলোতে ব্যস্ত উৎপাদন সময় চলছে। এমন সময়ে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন সূচি ও রপ্তানি চালান পাঠানোর সময়সীমা ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট উৎপাদকরা।
কম শ্রমমূল্য এবং পশ্চিমা বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ শিল্পটির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
মজুরি বোর্ডের উদ্যোগে শ্রমিক অসন্তোষ কতটা প্রশমিত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকরের সময় নির্ধারিত হলেও বৃদ্ধির পরিমাণ ঘোষণা করা হয়নি। শ্রমিকদের দাবি ও মালিকপক্ষের সক্ষমতার মধ্যে সমন্বয় করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন সংশ্লিষ্টদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।