
ছবি: সংগৃহীত
পবিত্র কোরআন মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহ তাআলার নাজিলকৃত সর্বশেষ কিতাব। এর মূল উদ্দেশ্য মানুষকে হেদায়াত দেওয়া, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য শেখানো এবং স্রষ্টার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সুদৃঢ় করা। কোরআন কোনো পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের পাঠ্যবই নয়। তবে কোরআনে অসংখ্য আয়াতে মানুষকে আকাশ, পৃথিবী, প্রাণী, উদ্ভিদ, বৃষ্টি, সমুদ্র, মানবসৃষ্টি ও মহাবিশ্বের নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে বলা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের পরিবর্তনে বোধসম্পন্ন মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।”
—সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯০
এর পরের আয়াতে মুমিনদের পরিচয় দিতে বলা হয়েছে, তারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে।
অর্থাৎ ইসলাম জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ ও চিন্তাকে নিরুৎসাহিত করেনি; বরং সৃষ্টিজগতের দিকে তাকিয়ে স্রষ্টার পরিচয় অনুধাবনের আহ্বান জানিয়েছে।
১. কোরআন মানুষকে চিন্তা ও গবেষণার আহ্বান জানায়
কোরআনে বারবার প্রশ্ন করা হয়েছে—মানুষ কি দেখে না? চিন্তা করে না? পর্যবেক্ষণ করে না?
আল্লাহ বলেন—
“তারা কি উটের দিকে তাকিয়ে দেখে না, কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে? আর আকাশের দিকে, কীভাবে তা সমুন্নত করা হয়েছে? আর পর্বতমালার দিকে, কীভাবে তা স্থাপন করা হয়েছে? আর পৃথিবীর দিকে, কীভাবে তা বিস্তৃত করা হয়েছে?”
—সূরা আল-গাশিয়াহ, ৮৮:১৭–২০
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো—মানুষকে প্রকৃতির বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করতে বলা হয়েছে।
উটের শারীরিক গঠন, আকাশের বিস্তার, পর্বতের গঠন এবং পৃথিবীর প্রকৃতি—সবকিছুই মানুষের জন্য চিন্তার বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এ ধরনের আয়াত মুসলিম সভ্যতায় জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক ভিত্তি তৈরি করেছে।
২. মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও কোরআন
কোরআনের একটি বহুল আলোচিত আয়াত হলো—
“অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী উভয়ই সংযুক্ত ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং পানি থেকে প্রত্যেক জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করলাম। তবু কি তারা বিশ্বাস করবে না?”
—সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩০
এই আয়াতের “রাতক” ও “ফাতক” শব্দ নিয়ে তাফসিরকারদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। আধুনিক সময়ে কেউ কেউ এটিকে মহাবিশ্বের প্রাথমিক একত্রিত অবস্থা ও পরবর্তী বিস্তারের সঙ্গে তুলনা করেন।
তবে এখানে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোরআনের আয়াতকে আধুনিক Big Bang theory-এর সরাসরি বৈজ্ঞানিক সমীকরণ বলা ঠিক নয়। কারণ কোরআনের বক্তব্যের উদ্দেশ্য বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা নয়; বরং সৃষ্টিজগতের পেছনে আল্লাহর ক্ষমতা ও একত্বের নিদর্শন তুলে ধরা।
৩. মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ
কোরআনে বলা হয়েছে—
“আর আকাশ আমি শক্তি দ্বারা নির্মাণ করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি এর সম্প্রসারণকারী।”
—সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৪৭
আরবি “মূসিউন” শব্দটির অর্থ নিয়ে তাফসিরে বিভিন্ন ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। আধুনিক যুগে অনেকে এই আয়াতকে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সঙ্গে সম্পর্কিত করেন।
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ একটি প্রতিষ্ঠিত পর্যবেক্ষণভিত্তিক ধারণা। কিন্তু কোনো আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারকে আয়াতের একমাত্র অর্থ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
বরং বলা যায়, কোরআনের এই বক্তব্য মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের চিন্তার দরজা খুলে দেয়।
৪. পানি ও জীবনের সম্পর্ক
জীবনের সঙ্গে পানির সম্পর্ক নিয়ে কোরআনের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ বলেন—
“আমি পানি থেকে প্রত্যেক জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছি।”
—সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৩০
আরেক জায়গায় বলা হয়েছে—
“আর আল্লাহ প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন।”
—সূরা আন-নূর, ২৪:৪৫
আধুনিক জীববিজ্ঞানেও পানিকে জীবনের জন্য অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মানুষের শরীরের বড় একটি অংশ পানি এবং কোষীয় বিভিন্ন কার্যক্রমে পানি অপরিহার্য।
এ কারণে কোরআনের পানি-সম্পর্কিত বক্তব্য মানুষের জন্য গভীর চিন্তার বিষয়।
৫. বৃষ্টি ও পানিচক্র
কোরআনে বৃষ্টি, মেঘ ও পানির চক্র নিয়ে একাধিক আয়াত রয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
“তুমি কি দেখ না, আল্লাহ মেঘমালাকে পরিচালিত করেন, তারপর সেগুলোকে একত্র করেন, তারপর সেগুলোকে স্তূপীকৃত করেন; অতঃপর তুমি দেখতে পাও, তার মধ্য থেকে বৃষ্টি বের হয়ে আসে।”
—সূরা আন-নূর, ২৪:৪৩
আরেক জায়গায় বলা হয়েছে—
“তিনি আকাশ থেকে পরিমাণমতো পানি বর্ষণ করেন, তারপর তা ভূমিতে সংরক্ষণ করেন।”
—সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১৮
বাষ্পীভবন, মেঘ সৃষ্টি, ঘনীভবন এবং বৃষ্টিপাত—পৃথিবীর পানিচক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোরআন মানুষকে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার দিকে দৃষ্টি দিতে বলেছে।
৬. বাতাসের ভূমিকা
কোরআনে বাতাসকে শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে নয়, আল্লাহর নিদর্শন হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
“আর আমি বায়ুকে গর্ভধারণকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি, তারপর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছি।”
—সূরা আল-হিজর, ১৫:২২
“গর্ভধারণকারী” শব্দটি নিয়ে তাফসিরকারদের বিভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। আধুনিক যুগে কেউ কেউ এটিকে মেঘ ও বৃষ্টির প্রক্রিয়া কিংবা উদ্ভিদের পরাগায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন।
তবে আয়াতটির অর্থ নির্ধারণে তাফসিরের ভাষ্যকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
৭. মানব ভ্রূণের সৃষ্টি
কোরআনে মানুষের সৃষ্টি সম্পর্কে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত রয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
“অতঃপর আমি নুতফাকে ‘আলাকাহ’তে পরিণত করেছি, তারপর ‘আলাকাহ’কে মুদগাহতে পরিণত করেছি...”
—সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১৪
এখানে মানবসৃষ্টির বিভিন্ন পর্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও বলা হয়েছে—
“তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন এক বিন্দু বীর্য থেকে, অতঃপর তার জন্য নির্ধারণ করেছেন।”
—সূরা আবাসা, ৮০:১৯
আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞানের আলোকে এসব আয়াত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তবে আরবি শব্দগুলোর সঠিক অর্থ, প্রাচীন তাফসির এবং আধুনিক বিজ্ঞানের পরিভাষা এক নয়। তাই কোরআনের শব্দগুলোকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট টার্মের সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে ফেলা ঠিক নয়।
বরং কোরআনের মূল শিক্ষা হলো—মানুষের সৃষ্টি অত্যন্ত বিস্ময়কর এবং মানুষকে তার নিজের সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে স্রষ্টার ক্ষমতা উপলব্ধি করতে হবে।
৮. মানুষের নিজের শরীরেও আল্লাহর নিদর্শন
কোরআনে বলা হয়েছে—
“আর তোমাদের নিজেদের মধ্যেও (নিদর্শন রয়েছে); তোমরা কি দেখতে পাও না?”
—সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:২১
মানবদেহ নিজেই একটি বিস্ময়কর জগত।
হৃদ্যন্ত্র, মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র, রক্তসঞ্চালন, শ্বাসপ্রশ্বাস, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, জিনগত বৈশিষ্ট্য—প্রতিটি বিষয় গভীর গবেষণার ক্ষেত্র।
কোরআনের বক্তব্য হলো, মানুষ নিজের অস্তিত্ব নিয়েও চিন্তা করুক।
৯. আঙুলের ছাপের প্রসঙ্গ
কোরআনে বলা হয়েছে—
“মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্র করতে পারব না? অবশ্যই পারব; বরং আমি তার আঙুলের ডগাগুলো পর্যন্ত সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম।”
—সূরা আল-কিয়ামাহ, ৭৫:৩–৪
আধুনিক বিজ্ঞানে মানুষের আঙুলের ছাপ ব্যক্তিভেদে অত্যন্ত স্বতন্ত্র হওয়ায় শনাক্তকরণে ব্যবহার করা হয়।
অনেকে এই আয়াতকে ফিঙ্গারপ্রিন্টের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কিত করেন। তবে আয়াতের মূল প্রসঙ্গ হলো কিয়ামতের দিন মানুষের পুনরুত্থান—আল্লাহ চাইলে মানুষের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অঙ্গও পুনর্গঠন করতে সক্ষম।
অতএব, আয়াতটির মূল আকীদাগত বক্তব্যকে বাদ দিয়ে শুধু ফিঙ্গারপ্রিন্টকে কেন্দ্র করা উচিত নয়।
১০. পর্বত সম্পর্কে কোরআন
আল্লাহ বলেন—
“আমি কি পৃথিবীকে বিছানা করিনি এবং পর্বতমালাকে পেরেকস্বরূপ?”
—সূরা আন-নাবা, ৭৮:৬–৭
আরেক জায়গায় বলা হয়েছে—
“তিনি পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বত স্থাপন করেছেন, যাতে তা তোমাদের নিয়ে দুলে না যায়।”
—সূরা আন-নাহল, ১৬:১৫
আধুনিক ভূবিজ্ঞানে পর্বত, ভূত্বক ও টেকটোনিক প্লেটের সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল। অনেক পর্বতের গভীর ভূগর্ভস্থ অংশ রয়েছে।
তবে “পর্বত পৃথিবীর নড়াচড়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়”—এমন সরল বৈজ্ঞানিক দাবি করা ঠিক হবে না। ভূমিকম্পও ঘটে, পর্বতও টেকটোনিক প্রক্রিয়ার ফল।
কোরআনের আয়াতকে ভূতত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যবই হিসেবে নয়, বরং সৃষ্টির নিদর্শন হিসেবে দেখা অধিক সংগত।
১১. দুই সমুদ্রের মাঝখানে প্রতিবন্ধক
কোরআনে বলা হয়েছে—
“তিনি দুই সমুদ্রকে প্রবাহিত করেছেন, তারা পরস্পর মিলিত হয়। তাদের মধ্যে রয়েছে এক অন্তরাল, তারা তা অতিক্রম করে না।”
—সূরা আর-রহমান, ৫৫:১৯–২০
আরেক জায়গায় বলা হয়েছে—
“দুই সমুদ্র সমান নয়—একটি সুপেয় ও মিষ্টি, অন্যটি লবণাক্ত ও তিক্ত; আর উভয়ের মাঝে তিনি রেখেছেন একটি অন্তরাল ও দুর্ভেদ্য প্রতিবন্ধক।”
—সূরা আল-ফুরকান, ২৫:৫৩
সমুদ্রবিজ্ঞানে বিভিন্ন জলভাগের মধ্যে লবণাক্ততা, তাপমাত্রা, ঘনত্ব ও স্রোতের পার্থক্যের কারণে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন দেখা যায়।
তবে এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয় যে দুই সমুদ্রের পানি কখনোই একে অপরের সঙ্গে মেশে না। বাস্তবে জলরাশির মধ্যে মিশ্রণ ঘটে।
১২. রাত ও দিনের পরিবর্তন
কোরআনে বারবার রাত ও দিনের পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
“তিনি রাতকে দিনের মধ্যে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতের মধ্যে প্রবেশ করান।”
—সূরা আল-হাদিদ, ৫৭:৬
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে—
“তিনি রাতকে দিনের ওপর আবৃত করেন এবং দিনকে রাতের ওপর আবৃত করেন।”
—সূরা আয-যুমার, ৩৯:৫
পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফলে দিন ও রাতের পরিবর্তন ঘটে। কোরআন মানুষকে এই পরিবর্তনকে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে দেখতে বলেছে।
১৩. সূর্য ও চন্দ্র
কোরআনে সূর্য ও চন্দ্র সম্পর্কে বলা হয়েছে—
“সূর্য ও চন্দ্র হিসাব অনুযায়ী চলছে।”
—সূরা আর-রহমান, ৫৫:৫
আরও বলা হয়েছে—
“সূর্য তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে চলমান।”
—সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৩৮
এখানে কোরআন মহাজাগতিক শৃঙ্খলা ও নির্ধারিত নিয়মের প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান দেখিয়েছে যে সূর্য নিজেও স্থির নয়; এটি নিজ গ্যালাক্সিতে গতিশীল এবং নিজের অক্ষেও ঘোরে।
১৪. মহাবিশ্বে শৃঙ্খলা
কোরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—প্রকৃতিকে বিশৃঙ্খল নয়, বরং নির্দিষ্ট নিয়ম ও পরিমাপের অধীন হিসেবে উপস্থাপন করা।
আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই আমি প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।”
—সূরা আল-কামার, ৫৪:৪৯
আধুনিক বিজ্ঞানও প্রকৃতির নিয়ম, ধ্রুবক, পরিমাপ ও কারণ-ফল সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
মহাবিশ্বের নিয়মতান্ত্রিকতা বিজ্ঞানীদের গবেষণার ভিত্তি।
১৫. কোরআন জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব দিয়েছে
কোরআনের প্রথম নাজিল হওয়া শব্দগুলোর একটি হলো—
“পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।”
—সূরা আল-আলাক, ৯৬:১
এরপর বলা হয়েছে—
“যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন।”
—সূরা আল-আলাক, ৯৬:৪
এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ইসলামের সূচনা হয়েছে পড়া, জ্ঞান ও শিক্ষার আহ্বান দিয়ে।
আল্লাহ আরও বলেন—
“বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না—তারা কি সমান?”
—সূরা আয-যুমার, ৩৯:৯
অর্থাৎ জ্ঞান ইসলামী চিন্তায় একটি মর্যাদাপূর্ণ বিষয়।
১৬. হাদিসে জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।”
—সহিহ মুসলিম
আরেকটি প্রসিদ্ধ হাদিসে এসেছে—
“জ্ঞানীদের নবীদের উত্তরাধিকারী বলা হয়েছে।”
এটি জ্ঞানচর্চার মর্যাদা বোঝায়।
তবে এখানে জ্ঞান বলতে শুধু আধুনিক প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নয়; ইসলামী জ্ঞান, নৈতিক জ্ঞান ও মানুষের কল্যাণে প্রয়োজনীয় জ্ঞান—সবই প্রসঙ্গভেদে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
১৭. চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাপারে ইসলাম
ইসলাম রোগ হলে চিকিৎসা গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করেনি।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“আল্লাহ এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি, যার চিকিৎসাও তিনি অবতীর্ণ করেননি।”
—সহিহ বুখারি
এই হাদিস চিকিৎসা অনুসন্ধান ও রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অর্থাৎ অসুস্থ হলে শুধু অলৌকিকতার অপেক্ষায় বসে থাকা নয়; চিকিৎসা নেওয়া এবং কারণ অনুসন্ধান করাও ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
১৮. পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।”
—সহিহ মুসলিম
ইসলামে ওজু, গোসল, দাঁত পরিষ্কার, কাপড় ও শরীর পরিচ্ছন্ন রাখা, খাবারের ক্ষেত্রে সতর্কতা—এসবের ওপর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞানেও পরিচ্ছন্নতা, হাত ধোয়া, নিরাপদ পানি, খাদ্যস্বাস্থ্য এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির গুরুত্ব অপরিসীম।
১৯. খাদ্য ও স্বাস্থ্য
কোরআনে বলা হয়েছে—
“খাও এবং পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।”
—সূরা আল-আরাফ, ৭:৩১
এখানে খাদ্যগ্রহণে ভারসাম্যের শিক্ষা রয়েছে।
অতিরিক্ত খাওয়া, অপচয় ও অসংযম মানুষের শারীরিক ও সামাজিক জীবনে ক্ষতিকর হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ খাবারের ব্যাপারে পরিমিতিবোধের শিক্ষা দিয়েছেন। বিখ্যাত হাদিসে এসেছে, মানুষের জন্য কয়েক লোকমাই যথেষ্ট; আর বেশি খেতে হলে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবার, এক-তৃতীয়াংশ পানীয় এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাসের জন্য রাখার নির্দেশনা এসেছে—সুনান তিরমিজি।
২০. মধু ও চিকিৎসা
কোরআনে মৌমাছি সম্পর্কে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা রয়েছে—সূরা আন-নাহল।
আল্লাহ বলেন—
“তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় বের হয়, যাতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য।”
—সূরা আন-নাহল, ১৬:৬৯
মধুর বিভিন্ন উপাদানের জীবাণুরোধী ও অন্যান্য সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে আধুনিক গবেষণা হয়েছে।
তবে এটিও মনে রাখা জরুরি—কোরআনের “শিফা” কথাটিকে সব রোগের একমাত্র চিকিৎসা হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
২১. মশা ও ক্ষুদ্র প্রাণীর উদাহরণ
কোরআনে আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ মশা কিংবা তার চেয়েও ক্ষুদ্র কোনো কিছুর উদাহরণ দিতে সংকোচবোধ করেন না।”
—সূরা আল-বাকারা, ২:২৬
এখানে অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি প্রাণীকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
আজকের জীববিজ্ঞান দেখিয়েছে, ক্ষুদ্র প্রাণী ও কীটপতঙ্গের জগৎ কতটা জটিল। একটি ক্ষুদ্র মশার শারীরিক গঠন, ইন্দ্রিয়, জীবনচক্র ও রোগ সংক্রমণের প্রক্রিয়া বিশাল গবেষণার বিষয়।
২২. পিঁপড়া সম্পর্কে কোরআন
সূরা আন-নামলে পিঁপড়ার একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
সুলাইমান (আ.)-এর বাহিনী অতিক্রম করার সময় একটি পিঁপড়া অন্য পিঁপড়াদের সতর্ক করেছিল—
“হে পিঁপড়েরা! তোমরা তোমাদের বাসস্থানে প্রবেশ করো, যেন সুলাইমান ও তাঁর বাহিনী অজ্ঞাতসারে তোমাদের পিষে না ফেলে।”
—সূরা আন-নামল, ২৭:১৮
পিঁপড়ার সামাজিক সংগঠন, যোগাযোগব্যবস্থা, খাদ্য সংগ্রহ ও দলগত আচরণ আধুনিক জীববিজ্ঞানে সুপরিচিত গবেষণার বিষয়।
কোরআনের এই বর্ণনা মানুষকে ক্ষুদ্র প্রাণীর জগতের প্রতিও দৃষ্টি দিতে শেখায়।
২৩. মাকড়সার ঘর
কোরআনে বলা হয়েছে—
“যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার মতো, যে ঘর বানায়; আর নিশ্চয়ই ঘরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ঘর মাকড়সার ঘর।”
—সূরা আল-আনকাবুত, ২৯:৪১
এখানে মূল শিক্ষা হলো—আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর ওপর নির্ভরতার দুর্বলতা।
এ আয়াতকে শুধু মাকড়সার জালের শারীরিক শক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করলে আয়াতের মূল নৈতিক শিক্ষা আড়াল হয়ে যায়।
২৪. বিজ্ঞান ও ঈমান—দুটির সম্পর্ক কী?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে।
কোরআন বিজ্ঞানের বই নয়।
কোরআনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো—
মানুষকে আল্লাহর পরিচয় দেওয়া;
সঠিক বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা;
নৈতিক জীবন শেখানো;
অন্যায় থেকে বিরত রাখা;
আখিরাতের কথা স্মরণ করানো;
সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করা।
বিজ্ঞান অনুসন্ধান করে—কীভাবে কোনো ঘটনা ঘটে।
ধর্ম ও দর্শন অনেক সময় প্রশ্ন করে—কেন, এর উদ্দেশ্য কী এবং মানুষের দায়িত্ব কী।
উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞান বৃষ্টির বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে পারে। কিন্তু বৃষ্টি মানুষের জীবনে কেন গুরুত্বপূর্ণ, প্রকৃতির প্রতি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব কী—এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু পরীক্ষাগারে পাওয়া যায় না।
২৫. “বৈজ্ঞানিক মুজিজা” বলার ক্ষেত্রে সতর্কতা
বর্তমানে কোরআনের অনেক আয়াতের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মিল দেখিয়ে “Scientific Miracle of Quran” বলা হয়।
এ ধরনের আলোচনায় কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি।
প্রথমত, কোরআনের আয়াতের অর্থ নির্ধারণে আরবি ভাষা ও তাফসিরের গুরুত্ব রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বিজ্ঞানের তত্ত্ব পরিবর্তনশীল হতে পারে। আজকের কোনো বৈজ্ঞানিক মডেল ভবিষ্যতে সংশোধিত হতে পারে।
তৃতীয়ত, একটি আয়াতের ওপর এমন বৈজ্ঞানিক অর্থ চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়, যা প্রাচীন আরবি ভাষা বা তাফসিরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
চতুর্থত, কোরআনের সত্যতা প্রমাণের জন্য কেবল সাময়িক বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন নেই।
কোরআনের মূল দাবি হলো—এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়াত।
২৬. কোরআনের সবচেয়ে বড় “বৈজ্ঞানিক” শিক্ষা
কোরআনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়; বরং জ্ঞান অনুসন্ধানের মানসিকতা।
কোরআন মানুষকে বলে—
দেখো।
চিন্তা করো।
পর্যবেক্ষণ করো।
প্রশ্ন করো।
সৃষ্টিজগত নিয়ে গবেষণা করো।
তারপর স্রষ্টার নিদর্শন উপলব্ধি করো।
আল্লাহ বলেন—
“অচিরেই আমি তাদের আমার নিদর্শন দেখাব দিগন্তসমূহে এবং তাদের নিজেদের মধ্যেও, যতক্ষণ না তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে এটি সত্য।”
—সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৫৩
এই আয়াতের মধ্যে প্রকৃতি ও মানুষের নিজের অস্তিত্ব—উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহর নিদর্শন অনুসন্ধানের আহ্বান রয়েছে।
উপসংহার
কোরআনকে বুঝতে হলে শুধু আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সঙ্গে আয়াত মিলিয়ে দেখলেই হবে না। কোরআনকে তার ভাষা, প্রেক্ষাপট, তাফসির, আকীদা ও নৈতিক শিক্ষার আলোকে বুঝতে হবে।
কোরআন মানুষকে আকাশের দিকে তাকাতে বলেছে, পৃথিবী নিয়ে ভাবতে বলেছে, নিজের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করতে বলেছে, প্রাণী ও উদ্ভিদ পর্যবেক্ষণ করতে বলেছে, পানি ও বৃষ্টির কথা ভাবতে বলেছে এবং জ্ঞান অর্জনের মর্যাদা দিয়েছে।
তাই কোরআনের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ককে সবচেয়ে সুন্দরভাবে বলা যায়—
বিজ্ঞান সৃষ্টিজগতের নিয়ম আবিষ্কার করে; কোরআন সেই সৃষ্টিজগতের নিদর্শন দেখে মানুষকে স্রষ্টার দিকে ফিরে যেতে আহ্বান করে।
আর একজন মুমিনের কাছে প্রকৃত জ্ঞান তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সেই জ্ঞান তাকে অহংকারী না করে বরং স্রষ্টার মহত্ত্ব উপলব্ধি করায়।
আল্লাহ বলেন—
“আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই যথাযথভাবে ভয় করে।”
—সূরা ফাতির, ৩৫:২৮
অতএব, বিজ্ঞান যত গভীর হয়, সৃষ্টিজগতের বিস্ময়ও তত প্রকাশ পায়; আর একজন মুমিন সেই বিস্ময়ের মধ্য দিয়ে আল্লাহর কুদরত ও হিকমত উপলব্ধি করার চেষ্টা করে।