
০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৪৩ পিএম
গাজীপুরের কাশিমপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সরকারি দাপ্তরিক কাজে গুরুতর অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা এবং বহিরাগত ব্যক্তিদের দিয়ে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে অফিসটির সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সোমবার (৩ আগস্ট) সকালে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার আকস্মিক পরিদর্শনে এসব অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর ঘটনাস্থলেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, গাজীপুর জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, নামজারি ও ভূমিসংক্রান্ত সেবা পেতে অস্বাভাবিক বিলম্ব এবং সরকারি নিয়ম অনুসরণ না করার বিষয়ে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ছিল। এসব অভিযোগের বাস্তব চিত্র যাচাই করতেই জেলা প্রশাসক আকস্মিক পরিদর্শনের উদ্যোগ নেন।
পরিদর্শনে যা পাওয়া গেল
জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহেল রানা, গাজীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজ্জাদ হোসেন এবং টঙ্গী রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) হাসিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে দেখা যায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবর্তে বহিরাগত লোকজন অফিসের বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী না হয়েও অফিসের নথিপত্র ও সেবাপ্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত ছিলেন, যা সরকারি প্রশাসনিক বিধিবিধানের পরিপন্থী।
এ ছাড়া দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে নামজারিসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক নথি এবং সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনার তথ্য চাইলে তারা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা বা প্রয়োজনীয় নথি উপস্থাপন করতে পারেননি। এতে প্রশাসনের কাছে দায়িত্বে অবহেলা ও প্রশাসনিক অদক্ষতার প্রাথমিক প্রমাণ মিলেছে বলে জানানো হয়েছে।
যাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে
বরখাস্ত হওয়া চার কর্মকর্তা-কর্মচারী হলেন—
ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. ওয়াজেদ আলী খান
অফিস সহায়ক মো. শফিকুল ইসলাম
মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল
তাপস চন্দ্র শীল
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জেলা প্রশাসক যা বললেন–
জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, “সকালে কাশিমপুর ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, কর্মরত কেউই কাজের উপযুক্ত নন। সরকারি নিয়ম মেনে কোনো কাজই সেখানে হচ্ছিল না।”
তিনি আরও বলেন, “সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা কাগজপত্র ও নামজারির সফটওয়্যার দেখতে চাই। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কোনো নথি বা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। দাপ্তরিক কাজে এমন চরম অবহেলা ও অনিয়মের কারণে অফিসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে।”
অভিযোগের গভীরে কী?
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, কেবল দায়িত্বে অবহেলাই নয়, সরকারি দাপ্তরিক কাজে বহিরাগতদের সম্পৃক্ততা একটি গুরুতর প্রশাসনিক বিষয়। কারণ ভূমি অফিসে সংরক্ষিত তথ্য, রেকর্ড ও নামজারি কার্যক্রম অত্যন্ত সংবেদনশীল। এসব কাজে অননুমোদিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা থাকলে তথ্যের নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং সেবার নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তবে বহিরাগতরা কীভাবে অফিসে কাজ করছিলেন, তারা কার নির্দেশে দায়িত্ব পালন করছিলেন, তাদের মাধ্যমে কোনো আর্থিক লেনদেন বা দালালচক্র সক্রিয় ছিল কি না—এসব বিষয়ে জেলা প্রশাসন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। বিষয়গুলো তদন্তে উঠে আসতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রের ইঙ্গিত।
এরপর কী হচ্ছে?
কাশিমপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক সফিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসও পরিদর্শন করেন। সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরকারি নিয়ম মেনে সেবা প্রদান, নথি সংরক্ষণ এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেলার অন্যান্য ইউনিয়ন ভূমি অফিসেও একই ধরনের আকস্মিক পরিদর্শন অব্যাহত থাকবে। কোথাও অনিয়ম, দুর্নীতি বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুসন্ধানে যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো বাকি
ঘটনাটি ঘিরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
* বহিরাগত ব্যক্তিরা কতদিন ধরে ভূমি অফিসে সরকারি কাজ করছিলেন?
* তাদের অফিসে প্রবেশ ও কাজ করার অনুমতি কে দিয়েছিল?
* নামজারি ও অন্যান্য সেবার বিনিময়ে কোনো অনিয়ম বা অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না?
* সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগের সংখ্যা কত এবং সেগুলোর প্রকৃতি কী?
* সাময়িক বরখাস্তের পাশাপাশি বিভাগীয় তদন্ত বা ফৌজদারি মামলা হবে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিললে কাশিমপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।