News update
  • রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মালয়েশিয়ার বক্তব্যে নতুন মোড়     |     
  • ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণা সংসদ ভবন থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে     |     
  • দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পুনরায় চালু     |     
  • স্থানীয় নির্বাচনে পোস্টার নিষিদ্ধ, বিলবোর্ডে মিলল সীমিত ছাড়     |     
  • চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ জন নিহত      |     
আন্তর্জাতিক 2026-08-03, 8:01pm

বন্দী সু চির সঙ্গে রেড ক্রস প্রতিনিধির বৈঠক

আলোচনায় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন

suti-6ab6657236deb33cdd4de302915b0a001785765678.jpg


মিয়ানমারের আটক সাবেক নেত্রী ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অং সান সু চির সঙ্গে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) এক প্রতিনিধির বৈঠক হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তার শারীরিক অবস্থা ও বন্দিজীবন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের মধ্যে রাজধানী নেপিডোতে এ সাক্ষাতের খবর প্রকাশ্যে এলো।


মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র খাইং খাইং সো এক টেলিগ্রাম বার্তায় জানান, সু চি আইসিআরসির মিয়ানমারে নিযুক্ত আবাসিক প্রতিনিধি আরনাউদ দ্য বেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সরকারের প্রকাশিত কয়েকটি ছবিতে সু চিকে বর্মি ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ওই প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা যায়। একটি ছবিতে তাকে কেক কাটতেও দেখা গেছে।


তবে বৈঠকটি ঠিক কোথায় এবং কবে অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। বৈঠকের বিষয়ে আইসিআরসির পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।


মিয়ানমারের ছায়া সরকার হিসেবে পরিচিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের (এনইউজি) মুখপাত্র নে ফোন লাট জানিয়েছেন, তারা আইসিআরসির পক্ষ থেকে বৈঠকের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণের অপেক্ষায় রয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সু চির নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।


রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান সু চি


অং সান সু চি মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ও দেশটির জাতির জনক হিসেবে পরিচিত জেনারেল অং সানের কন্যা। তার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৯ জুন রেঙ্গুনে, বর্তমান ইয়াঙ্গুনে। তার মা খিন চিও ছিলেন মিয়ানমারের একজন কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত।


শৈশব থেকেই রাজনীতির আবহে বেড়ে ওঠা সু চি পরবর্তী সময়ে বিদেশে পড়াশোনা করেন। তিনি ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন এবং পরে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেন। পরবর্তী জীবনে তিনি জাতিসংঘেও কাজ করেন।


ব্যক্তিজীবনে সু চি বিয়ে করেছিলেন ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ মাইকেল অ্যারিসকে। তাদের দুই ছেলে রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদেশে বসবাস করলেও মায়ের অসুস্থতার কারণে ১৯৮৮ সালে তিনি মিয়ানমারে ফিরে আসেন। সেই সময় দেশটিতে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন শুরু হলে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।


গণতন্ত্রের আন্দোলনে নেতৃত্ব


১৯৮৮ সালের গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সু চি মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন। একই বছর তিনি ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।


সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ও অহিংস আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দেশের গণতন্ত্রপন্থী মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তবে তার রাজনৈতিক উত্থানকে দমন করতে সামরিক জান্তা তাকে দীর্ঘ সময় গৃহবন্দি করে রাখে।


১৯৯০ সালের নির্বাচনে সু চির নেতৃত্বাধীন এনএলডি বিপুল বিজয় অর্জন করলেও সামরিক সরকার সেই ফলাফল মেনে নেয়নি। ফলে নির্বাচনে জয়ী হয়েও ক্ষমতায় যেতে পারেননি সু চি। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে তাকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়।


নোবেল শান্তি পুরস্কার


গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য অহিংস আন্দোলনের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯১ সালে অং সান সু চিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। তবে সে সময় তিনি গৃহবন্দি থাকায় পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে নিজে উপস্থিত হতে পারেননি।


দীর্ঘদিনের গৃহবন্দিত্ব তাকে মিয়ানমারের গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলে। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারকর্মী ও গণতন্ত্রপন্থীদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম মুখ।


ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সু চি


বহু বছর সামরিক শাসনের পর মিয়ানমারে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হলে সু চি ধীরে ধীরে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসেন। ২০১৫ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার দল এনএলডি বড় জয় পায়। তবে সাংবিধানিক বিধিনিষেধের কারণে সু চি সরাসরি প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি।


এরপর তিনি ‘স্টেট কাউন্সেলর’ পদে দায়িত্ব নেন এবং কার্যত দেশটির বেসামরিক সরকারের প্রধান হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। ২০২০ সালের নির্বাচনেও এনএলডি বড় জয় পায়। কিন্তু নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে সামরিক বাহিনী সেই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে।


২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থান ও বন্দিজীবন


২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের ক্ষমতা দখল করে। একই সঙ্গে অং সান সু চি, প্রেসিডেন্ট উইন মিন্টসহ এনএলডির শীর্ষ নেতাদের আটক করা হয়।


এরপর সু চির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। বিভিন্ন মামলায় বিচার শেষে তাকে প্রথমে ৩৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে তার সাজা কমিয়ে ১৮ বছর করা হয়।


সু চির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিভিন্ন দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, এসব বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সু চিকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় রাখার জন্যই এসব মামলা করা হয়েছে। তবে মিয়ানমারের সামরিক সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।


শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ


দীর্ঘদিন ধরে বন্দি থাকা সু চির শারীরিক অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তার সঙ্গে স্বাধীনভাবে সাক্ষাতের সুযোগ সীমিত থাকায় তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।


গত এপ্রিলে সামরিক সমর্থিত নির্বাচনের পর সাবেক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সু চিকে কারাগার থেকে গৃহবন্দিত্বে স্থানান্তর করা হয় বলে জানা গেছে।


এদিকে, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনসহ আসিয়ান জোটের কয়েকটি দেশ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দীর্ঘদিন ধরে সু চির সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়ে আসছিলেন। তবে এতদিন সামরিক সরকার তাদের সেই সুযোগ দেয়নি।


এই পরিস্থিতিতে আইসিআরসির প্রতিনিধির সঙ্গে সু চির সাক্ষাতের খবরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, তবু দীর্ঘ সময় পর আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার প্রতিনিধির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ তার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


অং সান সু চির রাজনৈতিক জীবন তাই একদিকে মিয়ানমারের গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম, নোবেল শান্তি পুরস্কার ও জনগণের বিপুল সমর্থনের ইতিহাস; অন্যদিকে সামরিক শাসন, দীর্ঘ গৃহবন্দিত্ব, ক্ষমতায় আসা এবং পুনরায় বন্দিজীবনে ফিরে যাওয়ার এক নাটকীয় রাজনৈতিক অধ্যায়। তার বর্তমান অবস্থাকে ঘিরে মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।


সূত্র: রয়টার্স