
ছবি-সংগৃহীত
চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতাকে জাপানের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে টোকিও বলেছে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় সক্ষমতা আরও জোরদার করার পাশাপাশি মিত্র ও সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন।
মঙ্গলবার জাপানের মন্ত্রিসভার অনুমোদন পাওয়া বার্ষিক প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্রে এ মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে। ৫৯৮ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এবারের শ্বেতপত্রে অ্যানিমে-ধাঁচের প্রচ্ছদের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো জাপানের প্রতিরক্ষা নীতি ব্যাখ্যা করে এমন সংক্ষিপ্ত ভিডিওর লিংক যুক্ত করা হয়েছে। চলতি বছর দেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নথি সংশোধনের আগে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এ শ্বেতপত্রের মাধ্যমে নাগরিকদের মধ্যে জাপানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতি সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা তৈরি হবে এবং জাতীয় নিরাপত্তা কীভাবে মানুষের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত, সে বিষয়ে ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
প্রতিবেদনের ভূমিকায় কোইজুমি উল্লেখ করেন, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সর্বশেষ নিরাপত্তা নথি সংশোধনের পর আইনভিত্তিক মুক্ত ও উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তিনি চীন ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, রাশিয়ার সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ থেকে উদ্ভূত নতুন ধরনের যুদ্ধকৌশলকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এজন্য সামরিক মহড়া, সেনা মোতায়েন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও শিল্প অবকাঠামোসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মিত্র ও সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে বহুমাত্রিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান জোট বজায় রাখার পাশাপাশি জাপান অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গেও নিরাপত্তা সহযোগিতা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে।
গত বছরের মতো এবারও চীনকে "অভূতপূর্ব কৌশলগত চ্যালেঞ্জ" হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেইজিংয়ের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জাপানসংলগ্ন এলাকায়, বিশেষ করে ইজু ও ওগাসাওয়ারা দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে তাদের তৎপরতা বেড়েছে।
জাপানের মতে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের সামরিক উপস্থিতি বাড়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত মুখোমুখি অবস্থার সৃষ্টি হয়ে তা বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কাও বেড়েছে।
প্রতিবেদনে গত ডিসেম্বরে চীনের লিয়াওনিং বিমানবাহী রণতরী থেকে উড্ডয়ন করা যুদ্ধবিমান দুটি পৃথক ঘটনায় ওকিনাওয়ার দক্ষিণ-পূর্বে আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় জাপানের এয়ার সেলফ-ডিফেন্স ফোর্সের বিমানের ওপর রাডার লক করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া গত গ্রীষ্মে লিয়াওনিংসহ দুটি বিমানবাহী রণতরী পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েন এবং জাপানি বিমানের কাছাকাছি চীনা যুদ্ধবিমানের একাধিকবার উড্ডয়নের ঘটনাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। টোকিওর মতে, এসব ঘটনার ফলে সংঘর্ষের ঝুঁকি বেড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য চীনা নৌ অবরোধের মতো পরিস্থিতিতে সমষ্টিগত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগের মন্তব্যের পর দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই শ্বেতপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।
যদিও ওই মন্তব্যের কারণে সৃষ্ট কূটনৈতিক উত্তেজনার কথা প্রতিবেদনে সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে তাইওয়ানের আশপাশের সমুদ্র ও আকাশসীমায় চীনের সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধিকে নিয়ে জাপানের উদ্বেগ পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, তথাকথিত 'গ্রে জোন' সামরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে চীনের একীকরণ প্রচেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে চীনের কোস্টগার্ডের জাহাজ ব্যবহার করে তাইওয়ান অবরোধের সম্ভাবনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ান প্রণালির স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং এ অঞ্চলের পরিস্থিতির ওপর জাপান নিবিড় নজর রাখবে।
জাপানের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে বেইজিংয়ের সমালোচনার জবাবে শ্বেতপত্রে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে যে, দেশটি কেবল আত্মরক্ষামূলক নীতি অনুসরণ করে এবং অন্য দেশের জন্য হুমকি হয়ে ওঠার মতো সামরিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য তাদের নেই।
এতে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের তিনটি অ-পারমাণবিক নীতিকে সরকার এখনো নীতিগত নির্দেশনা হিসেবে অনুসরণ করছে। তবে কোইজুমি বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নিরাপত্তা নীতিরও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন নিজস্ব নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও গুরুত্ব দিচ্ছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জাপানসহ মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর আহ্বানের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ন্যাটো সদস্যদের মতো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোকেও মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার আহ্বান জানিয়েছেন, যার মধ্যে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মূল সামরিক ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখার কথা বলা হয়েছে।
গত মে মাসে দেওয়া এক বক্তব্যে হেগসেথ বলেন, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে জাপান সঠিক পথে এগোলেও মিত্র দেশ হিসেবে তাদের আরও বেশি অবদান রাখতে হবে।
জাপান সরকার ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের নির্দিষ্ট লক্ষ্য প্রকাশ না করে জানিয়েছে, ব্যয়ের নির্দিষ্ট হার নির্ধারণের চেয়ে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। শক্তিশালী ইয়েন ও অব্যাহত মূল্যস্ফীতির বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এবারের শ্বেতপত্রের অন্যতম মূল বার্তা হলো জাতীয় নিরাপত্তা নীতি দেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এবং প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায়ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।