
মিয়ানমারে নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর। এ সময় রোহিঙ্গারা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানান।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে সার্জিও গোরের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছায়। পরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তারা উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যান। প্রতিনিধিদলে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতসহ মার্কিন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছিলেন।
সফরকালে প্রতিনিধিদলটি ৪ নম্বর ক্যাম্পে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন করে। পাশাপাশি ৮-ওয়েস্ট ও ৬ নম্বর ক্যাম্প ঘুরে রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রা, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নেয়।
এ সময় একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘You have a home, we miss our home.’ এর মাধ্যমে রোহিঙ্গারা তাদের নিজ দেশে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানান। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলে তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার কথা শোনেন।
কেন বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা?
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্বের অধিকার ও বিভিন্ন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রোহিঙ্গারা দেশটির সামরিক অভিযান ও সহিংসতার কারণে কয়েক দফায় বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের আগস্টে ব্যাপক সামরিক অভিযান ও সহিংসতার পর প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আগে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিলিয়ে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে।
মানবিক কারণে বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিলেও দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দায়িত্ব বহন করতে গিয়ে দেশটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত নানা চাপের মুখে পড়ছে।
রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত বড় পরিসরে প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরতে অনিচ্ছুক।
সফরকালে রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং প্রত্যাবাসন নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন মার্কিন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা।
এর আগে বৃহস্পতিবার ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন সার্জিও গোর। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করা হয় এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সার্জিও গোরের কক্সবাজার সফরের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে গুরুত্ব পেতে পারে। তবে সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করে মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করাই সবচেয়ে জরুরি।